কক্সবাজারের উখিয়ায় বন রক্ষার দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেই বন ধ্বংস ও পাহাড় কাটার ভয়াবহ অভিযোগ উঠেছে। ইনানী রেঞ্জের কর্মকর্তাদের মদতে বন উজাড় করে গড়ে উঠছে বহুতল ভবন। এই ধ্বংসযজ্ঞের মূলে রয়েছে একটি শক্তিশালী ‘ঘুষ সিন্ডিকেট’।
গত তিন বছর ধরে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ফিরোজ-আল-আমিনের নেতৃত্বে এই চক্রটি সক্রিয় রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে তারা বনাঞ্চল ধ্বংস করে আসছে। বনের জমি বিক্রি, পাহাড় কাটা এবং গাছ পাচারের মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানলেও তারা রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, ইনানী রেঞ্জের আওতাধীন মনখালী, রাজাপালং, জালিয়া পালং ও ছোয়ানখালী বিটে নিয়মিত গাছ কেটে বিক্রি, ঝাউগাছ নিধন ও পাহাড় কেটে সমতল ভূমি তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া বনভূমি দখল ও বেচাকেনা, করাতকল পরিচালনা এবং বালু ও মাটি উত্তোলন করা হচ্ছে অবাধে। এই কর্মকাণ্ডে বন বিভাগের একাধিক বিট কর্মকর্তার সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন।
স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যমতে, সেখানে নতুন ঘর নির্মাণ করতে হলে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা এবং নতুন পানের বরজ করতে ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা ঘুষ দিতে হয়। বনের গাছ পাচারে ৩০ থেকে ৫০ হাজার এবং বনভূমি বিক্রিতে ৫০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এছাড়াও প্রতিটি করাতকল থেকে মাসে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা ‘মাসোহারা’ আদায় করা হয়। বালু ও মাটি পাচার বা বনভূমি দখলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত টাকা না দিলে বন আইনে মামলা দিয়ে হয়রানি করার ভয় দেখানো হয়।
জালিয়া পালং এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, বনাঞ্চল উজাড় করে ও পাহাড় কেটে বহুতল ভবন গড়ে তোলা হচ্ছে। কোথাও ড্রেজার মেশিন বসিয়ে পাহাড় সমতল করা হয়েছে। এতে সামাজিক বনাঞ্চল চোখের সামনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ রাজাপালং বিটের কর্মকর্তা মনিষুর রহমান এসব দেখেও রহস্যজনকভাবে নীরব রয়েছেন বলে স্থানীয়রা অভিযোগ তুলেছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ইনানী বিটে অন্তত দুই হাজার ঝাউগাছ কেটে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি গাছ তিন হাজার টাকা করে ইনানী সদর বিট ও রেঞ্জ কর্মকর্তা নিজেই বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। রাজাপালং বিটেও একই চিত্র দেখা গেছে; সেখানে পাহাড় কেটে দালানঘর, পানের বরজ ও ব্যক্তিগত বাগান তৈরি করা হয়েছে।
বিগত তিন বছরে পাহাড় কাটার সময় মাটি চাপা পড়ে অন্তত চারজন শ্রমিক মারা গেছেন। বন উজাড়ের ফলে দুটি হাতির মৃত্যু হয়েছে এবং অসংখ্য বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে এলাকার পরিবেশগত ভারসাম্য।
ইনানী রেঞ্জের প্রায় ১৭ হাজার হেক্টর বনভূমির মধ্যে ২৯৩৩.৬১ হেক্টর আয়তনের শেখ জামাল জাতীয় উদ্যান এখন কেবল কাগজে-কলমেই আছে, বাস্তবে এর অস্তিত্ব নেই। অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের এক সিনিয়র নেতাকে এই উদ্যান পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সেখান থেকেই শতবর্ষী গাছ কেটে বিক্রি করা হয়েছে।
জালিয়া পালং জুম্মাপাড়ার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে শত শত বছরের পুরোনো পাহাড় ধ্বংস করা হয়েছে। এখন একটি পাহাড়ও অবশিষ্ট নেই। প্রতিটি পাহাড়ের মাটি দুই থেকে পাঁচ লাখ টাকার বেশি দামে বিক্রি করা হয়েছে। এভাবে অন্তত ২০ থেকে ৩০টি পাহাড় বিলীন করা হয়েছে। এর সঙ্গে ইনানী রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তা রোকনোজ্জামান খোকন সরাসরি জড়িত বলে তিনি দাবি করেন।
ছোয়ানখালী এলাকার বাসিন্দা আব্দুল আলম বলেন, রাতের অন্ধকারে গাছ কাটা এবং বালু ও মাটি পাচার করা হচ্ছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে হুমকি দেওয়া হয়। এসব কাজে রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তারা সরাসরি জড়িত।
রাজাপালং তুতুরবিল এলাকার কৃষক নুরুল আমিন জানান, দুই বছর আগেও এখানে হাতি ও বন্যপ্রাণী ছিল। কিন্তু গত তিন বছরে সেখানে হাজারখানেক ঘর গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ঘর থেকে ৫০ হাজার থেকে ৮০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়েছে। এই টাকা তোলার সময় ব্যবহার করা করা হয় রেঞ্জ কর্মকর্তার নাম।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব অনিয়ম চললেও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে উখিয়ার প্রাকৃতিক বনজ সম্পদ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাবে।
অবশ্য এসব কাজে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছেন ইনানী’র রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. ফিরোজ-আল-আমিন। তিনি বলেন, সেখানে ছোটখাটো কিছু অনিয়ম হলেও অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে।
এরপরও এসব বিষয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ করেন ফিরোজ আল-আমিন।
কক্সবাজার দক্ষিণ বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল-মামুন বলেন, তদন্তে প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত রেঞ্জ কর্মকর্তা ও বিট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


