দুই মাস নয় দিনে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ প্রায় ৪ হাজার ৭০০ কর্মকর্তা-কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। আরও প্রায় ২০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের তালিকায় রয়েছেন। এদিকে নতুন করে ব্যাংকটিতে আরও প্রায় ৫ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে। ইসলামী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
চাকরির নিয়ম ভাঙার অভিযোগে গত ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে কর্মী ছাঁটাই শুরু করে ইসলামী ব্যাংক। ওইদিন ২০০ কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত ও ৪ হাজার ৭৭১ কর্মকর্তাকে ওএসডি (অফিসার অন স্পেশাল ডিউটি) করা হয়। পরে কয়েক ধাপে ওএসডি করা কর্মকর্তাদের মধ্য থেকেই রোববার পর্যন্ত ৪ হাজার ৫০০ জনকে বরখাস্ত করা হয়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিশেষ দক্ষতা মূল্যায়ন পরীক্ষায় উপস্থিত না হওয়ায় মোট ৪ হাজার ৯৭১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারিকে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। মোট ৫ হাজার ৩৮৫ জন কর্মীকে ওই পরীক্ষায় অংশ নিতে বলেছিল ব্যাংকটির মানবসম্পদ বিভাগ। এদের মধ্যে ৪১৪ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন যারা এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের বর্তমান কর্তৃপক্ষের ভাষায়, যাদেরকে পরীক্ষায় ডাকা হয়েছিল তাদের নিয়োগ ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
ব্যাংকটির একাধিক কর্মকর্তা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, ২০১৭ সালে দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংকটিকে জোরপূর্বক দখল করার পরে কোনো মূল্যায়ন পরীক্ষা না নিয়ে এবং সনদ যাচাই না করেই এসব কর্মকর্তা-কর্মচারিকে নিয়োগ দেয় এস আলম গ্রুপ।
‘ব্যাংকটি যখন এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে ছিল তখন প্রায় ১১ হাজার কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এই নিয়োগের বেশিরভাগ ছিল অস্বচ্ছ। এদের নিয়োগে কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়নি,’ বলেন ইসলামী ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল উদ্দিন জসীম।
এস আলমের আমলে নিয়োগ পাওয়া ৬ হাজারের বেশি কর্মী এখনো চাকরিতে বহাল রয়েছেন।
জুলাই অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর গত বছরের ২২ আগস্ট ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ পুনর্গঠন করে দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মাধ্যমে ব্যাংকটিতে এস আলমের সাত বছরের একক নিয়ন্ত্রণের সমাপ্ত ঘটে।
ব্যাংকটির নথি থেকে জানা যায়, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে নিয়োগ পাওয়া ১১ হাজার কর্মীর মধ্যে ৭ হাজার ২২৪ জন চট্টগ্রামের বাসিন্দা। এদের মধ্যে আবার সাড়ে ৪ হাজার কেবল পটিয়া উপজেলার অধিবাসী। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের বাড়ি চট্টগ্রামের পটিয়াতে।
এই কর্মকর্তাদের যোগ্যতা ও দক্ষতা যাচাই করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে একটি মূল্যায়ন পরীক্ষার আয়োজন করে ইসলামী ব্যাংক। তবে কিছু কর্মকর্তা এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে রিট করেন। হাইকোর্ট বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি নিষ্পত্তির নির্দেশ দেন।
জবাবে বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, ইসলামী ব্যাংক একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে কর্মীদের দক্ষতা যাচাইয়ের অধিকার রাখে। কারণ, প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কর্মক্ষমতা কর্মীদের যোগ্যতা ও দক্ষতার ওপর সরাসরি নির্ভরশীল।
এদিকে ছাঁটাই প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন করে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেছে ইসলামী ব্যাংক। ইতোমধ্যে ৫টি পদে নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে।
ব্যাংকটির একটি সূত্র জানিয়েছে, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে নিয়োগের জন্য শিগগির বিজ্ঞপ্তি আসবে। এ ছাড়া ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি অফিসার (এমটিও) পদে নিয়োগের জন্যও বিজ্ঞপ্তি দেবে ব্যাংকটি। এটি হবে সিনিয়র অফিসার পদমর্যাদার।
বিষয়টি স্বীকার করে ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের প্রধান এম কামাল উদ্দিন জসীম বলেন, ‘ব্যাংকটির ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব শক্তিশালী করতে এমটিও পদে নিয়োগ দেওয়া হবে। মেধাবিদের খুঁজে ব্যাংকে আনা হবে যাদে এদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যৎ এমডি, ডিএমডি বের হয়।’
প্রসঙ্গত, নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ব্যাংকটি থেকে নামে-বেনামে প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে এস আলম গ্রুপ। এখন পর্যন্ত ইসলামী ব্যাংকে এস আলমের ৭৭ শতাংশ শেয়ার চিহ্নিত করতে পেরেছে বর্তমান কর্তৃপক্ষ।


