ইসরায়েল ও লেবানন নতুন ধাপের যুদ্ধবিরতি কার্যকরে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী যুক্তরাষ্ট্র।
বুধবার মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, ওয়াশিংটনে আলোচনার পর দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নে সম্মত হয়েছে। তবে এর শর্ত হিসেবে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহকে ইসরায়েলে সম্পূর্ণভাবে হামলা বন্ধ এবং দক্ষিণ লেবাননের লিতানি নদী অঞ্চল থেকে ইসরায়েলের সব সেনাকে সরিয়ে নেওয়ার পাল্টাপাল্টি দাবি তুলেছে দুই পক্ষ।
ট্রাম্প প্রশাসনের এ ঘোষণাকে ইরানের সঙ্গে বৃহত্তর সমঝোতা এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রয়টার্সের খবরে জানা যায়, গত মাসেও দুই পক্ষ যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়। তবুও ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘর্ষ অব্যাহত ছিল। চলতি বছরের মার্চে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে লেবাননে প্রবেশ করে ইসরায়েল। এর আগে ফেব্রুয়ারির শেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরান হামলা শুরু করলে তেহরানের সমর্থনে ইসরায়েল সীমান্তে হামলা চালিয়ে আসছিল হিজবুল্লাহ।
এদিকে ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ নতুন করে যুদ্ধবিরতির ঘোষণার মধ্যেই কুয়েতে হামলা ও হরমুজ প্রণালিতে নতুন উত্তেজনা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে। কুয়েত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় দেশটির আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কিছু স্থাপনা এবং কূটনৈতিক এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে একজন নিহত এবং ৬০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।
হামলার পর বিমানবদরে সাময়িকভাবে বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখা হলেও পরে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করে পুনরায় উড়োজাহাজ চলাচল শুরু হয়।
তবে ইরানের রেভ্যুলশনারি গার্ড করপস দাবি করেছে, তারা কুয়েত বিমানবন্দরে কোনো হামলা চালায়নি। তাদের দাবি, মার্কিন সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া ইরানের ড্রোন ধ্বংসের চেষ্টায় মার্কিন প্রতিরোধী ক্ষেপণাস্ত্র লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বিমানবন্দরসহ বেসামরিক স্থাপনায় ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, বিমানবন্দরে ইচ্ছাকৃতভাবেই হামলা করা হয়েছিল।
মার্কিন সামরিক সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, তারা দক্ষিণ ইরানে নতুন করে ‘প্রতিরক্ষামূলক হামলা’ চালিয়েছে। এসব অভিযানে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতার চেষ্টা করা নৌযান এবং কেশম দ্বীপের কয়েকটি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে।
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানবিরোধী সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে উপসাগরীয় অঞ্চলে একাধিক হামলা চালিয়েছে তেহরান। এর ফলে বিশ্ব জ্বালানি বাজারেও অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবাহিত হতো।
গত সপ্তাহে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ বন্ধ এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালুর বিষয়ে একটি প্রাথমিক সমঝোতার অগ্রগতির ইঙ্গিত দিলেও এখনো কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি লেবাননের একটি সংবাদমাধ্যমকে বলেন, আলোচনা বন্ধ হয়নি, তবে এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতিও হয়নি।
ইরানের দাবি, সম্ভাব্য চুক্তির অংশ হিসেবে লেবাননের সংঘাত বন্ধের পাশাপাশি তাদের তেল বিক্রির আয় ব্যবহারের সুযোগ, জ্বালানি রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, বন্দর অবরোধ প্রত্যাহার এবং হরমুজ প্রণালিতে প্রভাব বজায় রাখার নিশ্চয়তা দিতে হবে।
অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, তার প্রধান লক্ষ্য ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখা। এক পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক অস্ত্র না রাখার বিষয়ে সম্মত হয়েছে এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি আলোচনায় সম্পৃক্ত রয়েছেন।
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেন, ‘চুক্তির বিষয়ে অগ্রগতি হলে তা এই সপ্তাহান্তেই দেখা যেতে পারে।’
এ দিকে যুদ্ধবিরতির আলোচনা চললেও লেবাননে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইসরায়েল। বুধবার দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি ড্রোন হামলায় অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে। বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলেও একটি গাড়িকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়।
জবাবে আরাগচি সতর্ক করে বলেন, ইসরায়েল যদি বৈরুতে হামলা চালায়, তাহলে ইরান কঠোর প্রতিক্রিয়া জানাবে।
ট্রাম্প তার সাক্ষাৎকারে আরও জানান, লেবানন ইস্যুতে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার মতবিরোধ হয়েছিল।
তবে সিএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নেতানিয়াহু বলেন, ইরান ইস্যুতে তার ও ট্রাম্পের মধ্যে মাঝে মাঝে কৌশলগত মতপার্থক্য থাকলেও মূল বিষয়ে তারা একমত।
চলমান সংঘাতে ইরান ও লেবাননে হাজারো মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। একই সঙ্গে জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ব্যাহত হওয়ায় বিশ্ব অর্থনীতিতেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।


