ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী। এবারের ভোটের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর ইশতেহারে কিছু ক্ষেত্রে মিল থাকলেও আদর্শ, লক্ষ্যমাত্রা এবং বাস্তবায়ন কৌশলে তীব্র বৈপরীত্য লক্ষ্য করা গেছে।
দুই দলই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, নারীর ক্ষমতায়ন, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকে তাদের প্রতিশ্রুতির কেন্দ্রে রেখেছে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, এসব প্রতিশ্রুতির গ্রহণযোগ্যতা শেষ পর্যন্ত নির্ভর করবে কাজের ধারাবাহিকতা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
বিএনপির ইশতেহারে সুশৃঙ্খল অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, ব্যাপক কর্মসংস্থান, শিক্ষা সংস্কার এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বেশ কয়েক বছর পর ইশতেহার প্রকাশ করা জামায়াত যুব কর্মসংস্থান, নারীর নিরাপত্তা, দ্রুত স্বাস্থ্যসেবা এবং ইনসাফ-ভিত্তিক শাসনের ওপর বেশি জোর দিয়েছে।
আদর্শিক পার্থক্য থাকার পরেও দুই দলই ইতিহাসের স্মৃতি সংরক্ষণ, জবাবদিহিতা জোরদার এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছে।
বিএনপির প্রধান প্রতিশ্রুতি
বিএনপি দেশব্যাপী বিভিন্ন কল্যাণমূলক উদ্যোগের প্রস্তাব করেছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রত্যেক পরিবারের সদস্যদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, কৃষক কার্ড এবং কৃষি বীমা। এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ এবং স্কুলে ‘মিড-ডে মিল’ ও বিনামূল্যে ইউনিফর্ম দেওয়া, মাধ্যমিক স্তরে তৃতীয় ভাষা শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ার দীর্ঘমেয়াদী লক্ষ্য।
এছাড়া পাঁচ লাখ সরকারি চাকরি, আইটি খাতে ১০ লাখ কর্মসংস্থান এবং বেকার ভাতা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি।
রাজনৈতিক সংস্কারের ক্ষেত্রে বিএনপি ব্যাপক পরিবর্তনের রূপরেখা দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা, সংসদে উচ্চকক্ষ গঠন যেখানে ২০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার নিয়োগ এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা। উপ-রাষ্ট্রপতি পদ প্রবর্তন এবং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর নির্ধারণ।
পাশাপাশি সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধনে কথাও বলা হয়েছে।
জামায়াতের প্রধান প্রতিশ্রুতি
জামায়াত নির্বাচিত হলে একটি দুর্নীতিমুক্ত ও ইনসাফভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছে। তাদের ইশতেহারের মূল দিকগুলো হলো, নারীর নিরাপত্তা ও মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। মাতৃত্বকালীন কর্মঘণ্টা কমানো এবং প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি।
এছাড়া ২৬টি রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার এবং কর্মসংস্থান ও যুব উন্নয়নে ৪১ দফার পরিকল্পনা।
২০৪০ সালের মধ্যে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি এবং বার্ষিক ৭ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নিয়েছে জামায়াত।
৭ কোটি যুবকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ৫০ লাখ কর্মীকে বিদেশে পাঠানোর লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে দলটি।
এছাড়া ইডেন, বদরুন্নেসা এবং গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের বৃহত্তম নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করবে বলেও ইশতেহারে জানিয়েছে জামায়াত।
অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান
দুই দলের অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পার্থক্য রয়েছে। বিএনপি ২০৩৫ সালের মধ্যে কর-জিডিপি অনুপাত ১৫ শতাংশে উন্নীত করতে চায়। জামায়াত আর্থিক খাতের সংস্কারের কথা বললেও নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা উল্লেখ করেনি।
জ্বালানি খাতে বিএনপি ২০৩০ সালের মধ্যে ৩৫ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যার ২০ শতাংশ আসবে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে। জামায়াত ব্যাপক সংস্কারের প্রস্তাব দিলেও কোনো সংখ্যাভিত্তিক লক্ষ্যমাত্রা দেয়নি।
কৃষি খাতে বিএনপি ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত সমবায় ভিত্তিক প্রযুক্তি-নির্ভর কৃষি রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছে।
শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা
উভয় দলই শিক্ষা কমিশন গঠন এবং বাজেট বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
এর মধ্যে বিএনপি শিক্ষা টিভি চ্যানেল চালু, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর অব্যাহতি এবং শিক্ষিত যুবকদের জন্য এক বছর পর্যন্ত বেকার ভাতা দেওয়ার কথা জানিয়েছে।
সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক ৩ হাজার টাকা উপবৃত্তি, স্নাতক শিক্ষার্থীদের জন্য মাসিক ১০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সুদমুক্ত ঋণ এবং ইবতেদায়ী মাদ্রাসা জাতীয়করণ করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াত।
স্বাস্থ্য খাতে বিএনপি জিডিপির পাঁচ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এবং দরিদ্রদের জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘স্বাস্থ্য সুরক্ষা তহবিল’ প্রস্তাব করেছে। জামায়াত স্বাস্থ্য বাজেট তিনগুণ করার এবং ৫ বছরের কম ও ৬০ বছরের বেশি বয়সীদের জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত
অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ শাহাদাত হোসেন সিদ্দিকী বলেন, দুই দলের ইশতেহারই উচ্চাভিলাষী কিন্তু এতে বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এবং জবাবদিহিতার অভাব রয়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন যে, সংস্কারের সঠিক ধারাবাহিকতা না থাকলে এই প্রতিশ্রুতিগুলো কাঙ্ক্ষিত ফলাফল দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
ব্র্যাক ইউনিভার্সিটির ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ শিক্ষা কমিশন গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে দলগুলো জনপ্রিয়তা পেতে অনেক প্রতিশ্রুতি দেয়, কিন্তু বাস্তবে তার কতটুকু কার্যকর হয় তা প্রশ্নসাপেক্ষ।’
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেনের মতে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নতুন সরকার গঠনের ছয় মাসের মধ্যে স্বাস্থ্য, পুলিশ ও প্রশাসনের জন্য স্বাধীন কমিশন গঠন করা উচিত।
ইতিহাস ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান
সংস্কৃতি ও ইতিহাসের ক্ষেত্রে দুই দলের ভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করা গেছে।
বিএনপি মুক্তিযুদ্ধের শহিদদের তালিকা এবং বধ্যভূমি সংরক্ষণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জামায়াত জুলাই অভ্যুত্থানকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে, যেখানে শহিদ ও আহতদের জন্য মাসিক উপবৃত্তি, অনুদান এবং তাদের পরিবারের আবাসন ও কর্মসংস্থানের অঙ্গীকার করা হয়েছে।
বিএনপিও জুলাই অভ্যুত্থানের শহিদদের নামে স্থানীয় স্থাপনা নির্মাণ এবং আহতদের বিশেষায়িত চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলেছে।


