ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভে এখন পর্যন্ত তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন। টানা আটদিন বন্ধ থাকার পর দেশটিতে ফের আংশিক ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়ার পর ধীরে ধীরে এসব নিহতের সংখ্যা সামনে আসতে শুরু করে।
শনিবার যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ জানায়, তারা বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তিন হাজার ৯০ জনের মৃত্যুর তথ্য যাচাই করেছে। নিহতদের মধ্যে দুই হাজার ৮৮৫ জনই বিক্ষোভকারী।
নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন অভিযানের ফলে আপাতত সরকার পতনের ডাক তোলা বিক্ষোভ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেও জানায় সংস্থাটি। দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমগুলোতেও হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ইরান সরকার দেশজুড়ে সহিংসতার জন্য সাধারণ বিক্ষোভকারীদের দায়ী না করে বরং ‘বিক্ষোভকারীর ছদ্মবেশে সশস্ত্র দাঙ্গাবাজদের’ ওপর দায় চাপিয়েছে। দেশটির কর্তৃপক্ষ সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের ‘দেশবিরোধী সন্ত্রাসী’ আখ্যা দিয়ে দাবি করেছে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র এসব সহিংসতায় মূল উস্কানিদাতা। এমনকি সাধারণ বিক্ষোভকারী ও শতাধিক নিরাপত্তারক্ষীর পেছনেও তারা দায়ী।
এদিকে টানা ২০০ ঘণ্টার ইন্টারনেট শাটডাউনের পর শনিবার সকালে কিছু কিছু এলাকায় নির্বিঘ্ন ইন্টারনেট ফিরে পান স্থানীয়রা। ইন্টারনেট পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা নেটব্লকস জানায়, ইরানে এখনো ইন্টারনেট সংযোগ স্বাভাবিক সময়ের মাত্র দুই শতাংশ।
দেশটির আধা-সরকারি মেহর নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, কিছু ব্যবহারকারীর জন্য ইন্টারনেট সেবা পুনরায় চালু হয়েছে। এসএমএস সেবা ও বিদেশে টেলিফোন সংযোগও ফের স্বল্প পরিসরে সচল করা হয়েছে।
তেহরানের পশ্চিমে কারাজ শহরের এক বাসিন্দা জানান, শনিবার ভোর ৪টার দিকে তিনি ইন্টারনেট ফিরে পেয়েছেন। কারাজ ছিল বিক্ষোভ চলাকালে সবচেয়ে সহিংস এলাকাগুলোর একটি। তার ভাষায়, গত বৃহস্পতিবার সেখানে পরিস্থিতি সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল। বিদেশে থাকা কিছু ইরানিও সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছেন, তারা ইরানের ভেতরে থাকা স্বজনদের সঙ্গে শনিবার যোগাযোগ করতে পেরেছেন।
এ ছাড়া রাজধানী তেহরানসহ ইরানের বড় বড় শহরের বাসিন্দারা রয়টার্সের সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তেহরান গত চার দিন ধরে তুলনামূলকভাবে শান্ত রয়েছে। শহরের আকাশে ড্রোন উড়তে দেখা গেলেও বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার বড় ধরনের কোনো বিক্ষোভ হয়নি।

গত ২৮ ডিসেম্বর অর্থনৈতিক সংকট, তীব্র মুদ্রাস্ফীতি, ডলারের বিপরীতে ইরানি রিয়ালের নজিরবিহীন দরপতনের প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়তুল্লাহ খামেনির ইসলামি প্রজাতন্ত্রের শাসন অবসানের দাবিতে রূপ নেয়।
বিক্ষোভ দমনে ইরানি কর্তৃপক্ষ সশস্ত্র বল প্রয়োগ করলে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্রে নির্বাসিত ইরানি ক্রাউন প্রিন্স রেজা পাহলভি অনলাইনে ভিডিও বার্তায় বিক্ষোভ চালিয়ে যেতে আহ্বান জানানোর পর নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সহিংসতায় জড়ায় বিক্ষোভকারীরা। তাদের সমর্থন জানিয়ে একাধিক বার্তা দেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ইরানের বিরোধী গোষ্ঠী ও এক সরকারি কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর এটিই ছিল দেশের সবচেয়ে ভয়াবহ অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের চাপে ইরানের নেতারা আটক বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অন্তত ৮০০ জনের গণফাঁসির পরিকল্পনা বাতিল করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে তিনি জানান, নির্ধারিত ফাঁসি বাতিল হওয়াকে তিনি সম্মানের চোখে দেখছেন।
তবে ইরান কর্তৃপক্ষ এমন কোনো ফাঁসির পরিকল্পনা কিংবা বিক্ষোভকারীদের জন্য নির্ধারিত সাজা বাতিলের ঘোষণা দেয়নি। সরকারঘনিষ্ঠ ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, অস্থিরতার কয়েকজন ‘মূল হোতাকে’ গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের মধ্যে নাজানিন বারাদারান নামে এক নারীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে, যিনি ‘রাহা পারহাম’ ছদ্মনামে কাজ করতেন বলে দাবি করেছে নিরাপত্তা বাহিনী।
প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ইরানের শেষ শাহের নির্বাসিত পুত্র রেজা পাহলভির পক্ষে বিক্ষোভ সংগঠনে ভূমিকা রেখেছেন। রেজা পাহলভি দীর্ঘদিন ধরে ইরানের বিরোধী রাজনীতিতে সক্রিয় এবং নিজেকে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে উপস্থাপন করছেন। তিনি প্রকাশ্যে ইসরায়েলের সমর্থন পেয়েছেন বলে জানা যায়। ২০২৩ সালে তিনি ইসরায়েল সফর করেন এবং দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
বিক্ষোভ চলাকালে গত বৃহস্পতিবার তিনি ইরানের ক্ষমতায় ফিরলে ইসরায়েলকে রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়া হবে বলেও ঘোষণা দেন।


