ইয়েমেনে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের বিমান হামলার পর দেশটি থেকে নিজস্ব বাহিনী প্রত্যাহারের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই)।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, সৌদি সরকারের নির্দেশ মেনে আমিরাতের এই সিদ্ধান্ত দুই দেশের চলমান উত্তেজনা সাময়িকভাবে কমাতে পারে। অবশ্য অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ইয়েমেনে হামলায় আরব আমিরাতের সেনা প্রত্যাহার সৌদির বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের চাপা অবিশ্বাসকেই প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছে।
স্থানীয় সময় মঙ্গলবার ভোরে ইয়েমেনের মুকাল্লা বন্দরে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট বিমান হামলা চালায়। এর পর ইউএইয়ের বাহিনীকে ইয়েমেন ছাড়ার আহ্বান জানানো হয়।
রিয়াদের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে বলা হয়, সৌদি রাজতন্ত্রের জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপোষ করা হবে না। এটি একটি ‘রেড লাইন’ হিসেবে বিবেচিত করা হচ্ছে।
অন্যদিকে ইউএই জানায়, সৌদি জোটের এই বিমান হামলায় তারা বিস্মিত হয়েছে। হামলার পরপরই দেশটি ইয়েমেনে অবস্থানরত তাদের অবশিষ্ট সেনাদের প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
সেনাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইউএই কর্তৃপক্ষ।
ইয়েমেনকে ঘিরে সৌদি-সংযুক্ত আরব আমিরাত উত্তেজনার সূত্রপাত হয় চলতি ডিসেম্বরের শুরুতে। ইউএই সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলো ইয়েমেনের দক্ষিণাঞ্চলে দ্রুত অগ্রসর হলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে। এর ফলে উপসাগরীয় অঞ্চলের দুই প্রভাবশালী দেশের মধ্যে তেল উৎপাদন, আঞ্চলিক প্রভাব এবং ভূরাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে দীর্ঘদিনের বৈরিতা নতুন করে আলোচনায় আসে।
সৌদি আরবের নীতিনির্ধারণের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক উপসাগরীয় সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক উত্তেজনার পেছনে বড় একটি কারণ হলো দুই দেশের ভুল বোঝাবুঝি। এই বিভ্রান্তির শুরু হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আমন্ত্রণে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের ওয়াশিংটন সফরের সময়।
ওই সফরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে সুদানের গৃহযুদ্ধ নিয়ে আলোচনা হয়। সুদান ইউএইয়ের জন্য একটি স্পর্শকাতর বিষয়।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ ও যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকজন কংগ্রেস সদস্য অভিযোগ করেছেন, সুদানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইরত আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে ইউএই সমর্থন দিচ্ছে। তবে ইউএই শুরু থেকেই এসব অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
উপসাগরীয় সূত্রের দাবি, সৌদি যুবরাজ যুক্তরাষ্ট্রকে আরএসএফের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পাশাপাশি ইউএইয়ের বিরুদ্ধেও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। ইউএইর কাছে এমন তথ্য আসার পর দেশটির সরকার সৌদি সরকারের বিরুদ্ধে বেশ ক্ষুব্ধ হয়, যার প্রভাব পড়ে ইয়েমেন পরিস্থিতিতেও।
এরপর থেকে সৌদি আরব ও ইউএইয়ের মধ্যে ফোনালাপসহ উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা চললেও মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা কমার স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে সংঘাত সৃষ্টি হলে তা অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী উপসাগরীয় অঞ্চলের জন্য বিপদজনক হতে পারে। বিশেষ করে ওপেকের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য সৌদি আরব ও ইউএইয়ের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দিলে তেল উৎপাদন সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে ঐকমত্য ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে দুই দেশই ওপেক প্লাসের আসন্ন ভার্চুয়াল বৈঠকের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউজের সহযোগী ফেলো নিল কুইলিয়াম বলেন, ‘সৌদি আরব ও ইউএইয়ের সম্পর্ক কখনোই সহজ ছিল না। বহু বছর ধরে চলা এই দ্বন্দ্ব বর্তমানে সবচেয়ে তীব্র পর্যায়ে পৌঁছেছে।’


