আগামী ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে চালানো জনমত জরিপে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এগিয়ে রয়েছে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ‘ইনোভিশন কনসাল্টিং’ রাজধানীর আগারগাঁও আর্কাইভ ভবনে বুধবার প্রকাশিত তাদের জরিপে এমন তথ্য প্রকাশ করেছে। ‘পিপলস ইলেকশন পালস সার্ভে রাউন্ড টু’-এর দ্বিতীয় অংশে প্রকাশিত এই জরিপে অংশ নেন দেশের ৮টি বিভাগের ৬৪ জেলার ৯ হাজার ৩৯৮টি পরিবার বা খনার ১০ হাজার ৪১৩ জন ভোটার।
জরিপে দেখা গেছে, ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে এগিয়ে। দলের পক্ষে সমর্থন জানিয়েছেন ৪১ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার। তাদের পরেই আছে জামায়াতে ইসলামী, যাদের সমর্থন পেয়েছে ৩০ দশমিক ৩ শতাংশ ভোটার।
গত বছরের গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ ভোট নিয়ে। যদিও দেশে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ, তারপরেও ১৭ দশমিক ৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন দলটি সরকারের গঠনের জন্য সবচেয়ে যোগ্য।
অন্যদিকে নবগঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৪ দশমিক ১ শতাংশ সমর্থন নিয়ে তালিকায় চতুর্থ।
ভোটারদের ধারণা, সরকার গঠনের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে বিএনপির। ৪০ শতাংশ ভোটার মনে করেন বিএনপি পরবর্তী সরকার গঠন করবে। ২৩ দশমিক ৩ শতাংশের মতে জামায়াতও সরকার গঠনের সম্ভাবনা রাখে। আওয়ামী লীগকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চান ১২ দশমিক ১ শতাংশ ভোটার। নতুন দল এনসিপির পক্ষে মত দিয়েছেন ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।
জরিপে উঠে এসেছে, প্রার্থীদের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও ভূমিকা ভোটের সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব ফেলবে। ৬৫ দশমিক ৫ শতাংশ ভোটার বলেছেন, তারা দলীয় প্রতীকের চেয়ে প্রার্থীকে গুরুত্ব দেবেন। অন্যদিকে মাত্র ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ ভোটার প্রতীক দেখে ভোট দেওয়ার কথা বলেছেন।
স্থানীয় রাজনীতিতে কার্যক্রম নিয়ে ভোটারদের সন্তুষ্টির চিত্রও এসেছে জরিপে। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়ে সন্তুষ্টির হার তুলনামূলক বেশি—১৩ দশমিক ৭ শতাংশ। বিএনপির ক্ষেত্রে সন্তুষ্টি ৮ দশমিক ২ শতাংশ, এনসিপির ৯ দশমিক ১ শতাংশ। তরুণ প্রজন্ম ও নারী ভোটারদের মধ্যে জামায়াতের কার্যক্রম নিয়ে সন্তুষ্টির প্রবণতা বেশি।
জরিপে দেখা গেছে, ৪৫ দশমিক ৫৮ শতাংশ ভোটার মনে করেন আওয়ামী লীগের বিচার না হলে নির্বাচনে অংশ নিতে দেওয়া উচিত নয়। আবার প্রায় সমান ৪৫ দশমিক ৭৯ শতাংশ ভোটার মনে করেন, সব দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া উচিত।
যদি আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশ না নেয়, তবে তাদের ভোটারদের একটি অংশ অন্য দলের দিকে ঝুঁকতে পারে। জরিপ বলছে, আওয়ামী লীগের প্রায় ২০ শতাংশ ভোটার বিএনপিকে, ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ জামায়াতকে এবং ২ দশমিক ১ শতাংশ এনসিপিকে ভোট দিতে আগ্রহী। এ অবস্থায় সরকার গঠনের জন্য যোগ্য দল হিসেবে বিএনপিকে মনে করেন ৩৯ দশমিক ১ শতাংশ, জামায়াতকে ২৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং এনসিপিকে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ ভোটার।
ভবিষ্যৎ সরকারের প্রতি ভোটারদের প্রত্যাশার মধ্যে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে পুলিশ সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নিরপেক্ষতা। তবে এখনও বড় একটি অংশ অনিশ্চয়তায় ভুগছে, তারা কোন দলকে সরকারে দেখতে চান তা স্পষ্ট করেননি। 
গত মার্চেও একই প্রতিষ্ঠানের একটি জরিপে বিএনপির ফলাফল ছিল ইতিবাচক। এবারের জরিপে দেখা গেছে, পছন্দ প্রকাশ করা ভোটারদের মধ্যে বিএনপির সমর্থন কমেছে শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ পয়েন্ট, জামায়াতের কমেছে ১ দশমিক ৩ শতাংশ পয়েন্ট। অপরদিকে আওয়ামী লীগের সমর্থন বেড়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশ পয়েন্ট।
জরিপে আঞ্চলিক ব্যবধানও স্পষ্ট হয়েছে। বিএনপি ৬টি বিভাগে এগিয়ে, জামায়াত রংপুরে শীর্ষে এবং আওয়ামী লীগ বরিশালে সবচেয়ে শক্ত অবস্থান দেখিয়েছে।
ইনোভিশন কনসাল্টিং-এর এই জরিপ রাজনৈতিক অঙ্গনের জন্য একটি তাৎপর্যপূর্ণ ইঙ্গিত দিয়েছে। নির্বাচনের আগে ভোটারদের মনোভাব কেমন, কোন দল জনপ্রিয়তায় শীর্ষে আর কারা সরকার গঠনের দৌড়ে সবচেয়ে এগিয়ে—এমন চিত্র স্পষ্ট হয়েছে এতে।


