যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জোট গড়ে তুলেছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ রাজা চার্লস তৃতীয়। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে মঙ্গলবার দেশটির কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে এ মন্তব্য করেন তিনি।
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ ও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে দুই দেশের রাজনৈতিক নেতাদের সতর্ক করে তিনি বলেন, ‘আমরা যেন নিজেদের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে না পড়ি, এমন কোনো আহ্বান আমাদের উপেক্ষা করতে হবে।’
বার্তা সংস্থা এপির খবরে বলা হয়, ভাষণে রাজা চার্লস বারবার দুই দেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক বন্ধনের কথা তুলে ধরেন। তবে ইতিবাচক ও ঐক্যের বার্তার মধ্যেও তিনি সূক্ষ্মভাবে যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের সমসাময়িক আন্তর্জাতিক বিষয়ে সক্রিয় ও সহযোগিতামূলক আচরণ প্রদর্শনের আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক ইরান যুদ্ধসহ নানা চ্যালেঞ্জে পরীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্য জোট কেবল অতীতের সাফল্যের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না। আমাদের প্রতিনিয়ত নিজেদের জোটকে মজবুত করে যেতে হবে।’

এ সময় ব্রিটিশ রাজা রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে সমর্থন দিয়ে ইউরোপে নিজেদের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেন। সেইসঙ্গে ইউরোপের দেশগুলোর বন্ধুত্ব ধরে রাখতে উত্তর আটলান্টিক সামরিক জোট ন্যাটোর গুরুত্ব তুলে ধরেন। সাম্প্রতিক সময়ে ইরান যুদ্ধে নিরব ভূমিকা রাখার জন্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ন্যাটোবিরোধী অবস্থান নিয়েছেন।
ধর্মীয় বহুত্ববাদ ও বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে সংলাপের গুরুত্ব নিয়েও কথা বলেন রাজা চার্লস। সেইসঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অনীহার ইঙ্গিত দিয়ে নীতিমালা শিথিল করার প্রেক্ষাপটে তিনি বলেন, ‘প্রকৃতি রক্ষা করা আমাদের সবার যৌথ দায়িত্ব, যা আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ।’
যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য উভয় দেশের রাজনীতিতে আলোচিত কুখ্যাত সন্ত্রাসী ও যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টিন কেলেঙ্কারির প্রসঙ্গেও পরোক্ষ ইঙ্গিত দেন রাজা চার্লস। তিনি সরাসরি নাম উল্লেখ না করলেও সমাজে বিদ্যমান নানা সমস্যার শিকারদের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।

প্রায় ২০ মিনিটের ভাষণে রাজা চার্লস সরাসরি ট্রাম্পের সমালোচনা না করলেও বিভিন্ন বক্তব্যে তার সঙ্গে মতবিরোধ স্পষ্ট ধরা পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্লেষকরা। অনেকে এ ভাষণকে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি রাজনৈতিক বলেও মন্তব্য করেছেন।
ব্রিটিশ রাজাদের মধ্যে তিনিই দ্বিতীয় ব্যক্তি, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দিলেন। এর আগে ১৯৯১ সালে তার মা রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ একই ধরনের ভাষণ দিয়েছিলেন।
রাজা চার্লসের মতে, তার মায়ের সময়ের তুলনায় বর্তমান বিশ্ব ‘আরও অস্থির ও বিপজ্জনক’ হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতি ওয়াশিংটনে নৈশভোজে ট্রাম্পকে হত্যার উদ্দেশে গুলি চালানোর ঘটনার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সহিংসতা কখনো সফল হবে না, হয় না।’
যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন ঘিরে রানি ক্যামিলাকে নিয়ে চার দিনের সফরে সেখানে অবস্থান করছেন রাজা চার্লস তৃতীয়। সফরের লক্ষ্য একদিকে স্বাধীনতার উদযাপন, অন্যদিকে দুই দেশের কিছুটা শিথিল হয়ে পড়া সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা।
যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছেই তিনি রানিকে সঙ্গে নিয়ে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।

স্বাগত বক্তব্যে ট্রাম্পও দুই দেশের ঘনিষ্ঠ ইতিহাসের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘আমেরিকার দেশপ্রেমিকরা আজ “মাই কান্ট্রি, টিস অব থি” গানটি গাইতে পারে, কারণ তাদের পূর্বপুরুষরা আগে “গড সেভ দ্য কিং” গেয়েছিলেন।’
পরে ওভাল অফিসে তাদের একান্ত বৈঠক হয়। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প রাজা চার্লসের সঙ্গে বৈঠককে ‘বেশ ফলপ্রসূ’ আখ্যা দিয়ে রাজা চার্লসকে ‘চমৎকার মানুষ’ উল্লেখ করেন।
পরে হোয়াইট হাউসের পূর্ব কক্ষে রাজকীয় দম্পতির সম্মানে রাষ্ট্রীয় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়। এতে দুই দেশের প্রায় ১৩০ জন অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অতিথিদের মধ্যে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, উচ্চ আদালতের বিচারপতি এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিরাও ছিলেন। সফরের অংশ হিসেবে রাজা চার্লস ও রানী ক্যামিলা নিউইয়র্ক সিটি ও ভার্জিনিয়াতেও যাবেন।


