সাবেক স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীকে হঠাৎ গ্রেপ্তার করা নিয়ে রাজনীতিতে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার কারণে বিএনপি সরকার তাকে হত্যা মামলায় আটক দেখিয়ে জেলবন্দী করেছে বলে অনেকে মনে করছেন। তবে বিভিন্ন সূত্র বলছে, আইনি প্রক্রিয়ায় মুক্ত করে শিরিন শারমিনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনের একটি চেষ্টা চলছে।
টাইমস অব বাংলাদেশ সামরিক, বেসামরিক ও কূটনৈতিক একাধিক সুত্রের সঙ্গে কথা বলে জানতে পেরেছে, পুরো বিষয়টি একটি পরিকল্পনার অংশ। শিরীন শারমিনের বিরুদ্ধে যেহেতু জুলাই অভ্যুত্থানের হত্যা মামলা রয়েছে, সেহেতু তাকে অন্য কোনো উপায়ে প্রকাশ্যে আনার বা মুক্ত করার সুযোগ নেই। তাই দায়ের হওয়া মামলায় আটক দেখিয়ে এরপর তাকে জামিনে বের করে আনা হবে। এই প্রক্রিয়া শেষ করতে বেশ কিছুদিন সময় লাগতে পারে।
প্রশ্ন হচ্ছে, প্রায় ২০ মাস পরে কেন তাকে এভাবে প্রকাশ্যে আনা হলো? একাধিক সুত্রের মতে, শিরীন শারমিনকে দিয়েই পতিত আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠিত করার প্রয়াস থেকেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিবেশী ভারত ও পশ্চিমারা নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছে। মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দলটির মন্ত্রী ও নেতা সাবের হোসেন চৌধুরিকে দিয়ে এমন প্রচেষ্টা চালানো হয়। সব মামলা থেকে সাবেরকে জামিন দিয়ে কিছুটা আগানো গেলেও খোদ আওয়ামী লীগের তরফ থেকে তা মেনে নেওয়া হয়নি।
এই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সুশীল সমাজের বেশ কিছু সদস্যদের একটি তালিকা করা হয়, যারা সাবেরের নেতৃত্বে নির্বাচনে অংশ নেবেন। তবে শেষ পর্যন্ত ওই প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
সূত্রগুলো বলছে, সাবের হোসেনের চেয়ে শিরীন শারমিন চৌধুরী ভদ্র ও নম্র রাজনীতিবিদ হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব। এ কারণেই আওয়ামী লীগ পুনর্গঠনে তাকে বেছে নেওয়া হয়েছে। এতে সবুজ সংকেত দিয়েছেন খোদ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা।
তবে দলের দুইজন মধ্যম স্তরের নেতা টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, শেখ হাসিনা নিজেই চলতি বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরে আসবেন এবং দলকে নেতৃত্ব দেবেন।
শিরীন শারমিন এতদিন কোথায় ছিলেন?
৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় শিরীন শারমিন সংসদ ভবনে ছিলেন। সেদিন দুপুরের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে তিনি সেখানে আটকা পড়েন। এরই মধ্যে উচ্ছৃঙ্খল জনতা সংসদ ভবনে ঢুকে ভাঙচুর-লুটপাট শুরু করলে তিনি এবং আরও কয়েকজন একটি কক্ষে আশ্রয় নেন। তার স্বামী সৈয়দ ইশতিয়াক হোসেন ছাড়াও সঙ্গে ছিলেন প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আহমেদ পলক। একটি মামলার শুনানিতে খোদ পলকই এ তথ্য দিয়েছেন।
প্রায় দশ ঘণ্টা আটকা থাকার পর সেনাবাহিনী শিরিন শারমিনকে উদ্ধার করে ক্যান্টনমেন্ট নিয়ে যায়। হাসিনার পতনের পর তার সহযোগী রাজনীতিবিদ, মন্ত্রী, আমলাসহ কয়েকশ’ মানুষকে সেনাবাহিনী নিরাপত্তার খাতিরে সেনানিবাসে আশ্রয় দিয়েছিল।
সে সময় সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা ৬০০ জনকে আশ্রয় দিয়েছে। আগস্টের শেষে তারা সবাই ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে চলে যান। তাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী আনিসুল হক, হাসিনার শিল্পবিষয়ক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানসহ অনেকে দেশের নানা প্রান্তে আটক হন।
তবে রহস্যজনকভাবে শিরীন শারমিনের কোনো হদিস ছিল না। তিনি ক্যান্টনমেন্টেই ছিলেন বলে আলোচনা চলছিল। কিন্তু সেনাবাহিনীর পক্ষে থেকে কখনো তা স্বীকার করা হয়নি।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের রমনা বিভাগের ডিসি রেজাউল করিম মঙ্গলবার সন্ধ্যায় টাইমস অব বাংলাদেশ’কে বলেন, শিরিন শারমিন চৌধুরী গোয়েন্দা নজরদারিতে ছিলেন। দুইদিন আগে ধানমন্ডিতে তার কাজিন আরিফ মাসুদ চৌধুরীর বাসায় যান। মঙ্গলবার ভোরে সেখান থেকে তাকে আটক করা হয়।
একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ক্যান্টনমেন্টে তাকে সসম্মানে রাখা হয়েছিল। শিরীন শারমিন ভালো ও ভদ্র মানুষ, তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। ফলে তাকে সে সম্মান দিয়েই সেনানিবাসে রাখা হয়।
সেনাবাহিনীর দুটি সূত্র ও রাজনীতি সচেতন কয়েকজন জানান, শিরীন শারমিন চৌধুরীকে সুনির্দিষ্ট কারণে রাখা হয়েছিল, যেন প্রয়োজনে তাকে কাজে লাগানো যায়। তারা মনে করেন, কোনো কারণে যদি রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করেন অথবা অন্তর্বর্তী সরকার তাকে অপসারণ করে তখন তিনিই হতেন একমাত্র ভরসা।
এ ছাড়া ইউনূস সরকারের ওপর সেনাবাহিনী পুরোপুরি ভরসা করতে চায়নি। অনেকের মতে, ইউনূস সরকার যে কোনো সময় ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার চেষ্টা করতে পারতো।
পাসপোর্ট ও ফোন
এতদিন প্রকাশ্যে না থাকলেও শিরীন শারমিন চৌধুরীর মুঠোফোন খোলা ছিল। টাইমস থেকে সোমবার তার ফোনে কল করা হলে সেটি খোলা পাওয়া যায়, যদিও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
টাইমস জানতে পেরেছে, অন্তর্বর্তী সরকার তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট বাতিল করার পর ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর তিনি ও তার স্বামী অনলাইনে পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেন। এরপর ক্যান্টনমেন্ট পাসপোর্ট অফিস থেকে তাদের ১০ অক্টোবর বায়োমেট্রিক নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের পাসপোর্ট ইস্যু হয়েছে কি না তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
আ.লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার আইন
আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর কার্যক্রম নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। ভিন্ন একটি আদেশে নিষিদ্ধ করা হয় ছাত্রলীগ। বর্তমান বিএনপি সরকার এই নিষিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি আইনি কাঠামোতে রূপ দিতে চায় বলে জানিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তবে এই প্রক্রিয়াতে আপত্তি জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সংসদের বিশেষ কমিটির আলোচনায় আইনি কাঠামোতে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্যরা একমত হলেও আপত্তি জানিয়েছেন জামায়াতের দুইজন সংসদ সদস্য।
জামায়াত মনোনীত এমপি গাজী নজরুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘কোনো রাজনৈতিক দলকে নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করার বিষয়টি নিয়ে ভবিষ্যতে যাতে কোনো প্রশ্ন না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে যথাযথভাবে আইনি কাঠামোটি পর্যালোচনা করা উচিত।’
এর আগে জাতীয় সংসদের প্রধান হুইপ নুরুল ইসলাম মনি টাইমসকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এরইমধ্যে অন্তর্বর্তী সরকার নিষিদ্ধ করে গেছে। বর্তমান সরকার তাদের নিষিদ্ধ করেনি। কোনো রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা সরকারের দায়িত্ব নয়। এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে জনগণ।’


