আহসান মঞ্জিল: প্রেমের আঁকিবুঁকিতে সৌন্দর্য হারাচ্ছে নবাবি প্রাসাদ

আহসান মঞ্জিল: প্রেমের আঁকিবুঁকিতে সৌন্দর্য হারাচ্ছে নবাবি প্রাসাদ
ছবি: সাইফুল্লাহ তাইফ/ টাইমস
Advertisement
Advertisement

পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক আহসান মঞ্জিলের সামনে পরিচিত দৃশ্য যুগলদের ছবি তোলা। কেউ প্রিয়জনের ছবি তুলছেন, কেউ দুজনের মুহূর্তটি ধরে রাখছেন মুঠোফোনের ক্যামেরায়। স্মৃতিকে ছবিতে বন্দী করে রাখার এই আকাঙ্ক্ষা স্বাভাবিক। কিন্তু কেউ কেউ সেই স্মৃতি ধরে রাখতে গিয়ে নিজেদের নাম খোদাই করছেন দেয়ালে, গাছের গায়ে।

ছবি: সাইফুল্লাহ তাইফ/ টাইমস

ভালোবাসার চিহ্ন রেখে যাওয়ার এই প্রবণতা শেষ পর্যন্ত ইতিহাসের গায়ে তৈরি করছে ক্ষত ।

প্রাসাদের এক কক্ষ থেকে অন্য কক্ষে যেতে দর্শনার্থীদের চোখে পড়ে দেয়ালজুড়ে অসংখ্য হৃদয়চিহ্ন। কোথাও দুটি নাম পাশাপাশি লেখা, কোথাও নামের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশেষ কোনো তারিখ। কারও কাছে এসব হয়তো প্রেমের স্মারক, বিশেষ মুহূর্তকে অমর করে রাখার চেষ্টা। কিন্তু এমন ব্যক্তিগত আবেগের প্রকাশ যখন একটি ঐতিহাসিক স্থাপনার গায়ে স্থায়ী দাগ ফেলে, তখন তা আর নিছক ব্যক্তিগত থাকে না। বরং আড়াল হয়ে যায় স্থাপত্যের নিজস্ব সৌন্দর্য, ব্যাহত হয় অন্য দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতা।

ছবি: সাইফুল্লাহ তাইফ/ টাইমস

আহসান মঞ্জিল শুধু একটি পুরোনো প্রাসাদ নয়। এটি ঢাকার ইতিহাস, নবাবি আমলের স্মৃতি এবং এ অঞ্চলের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেড় শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্থাপনা দেখেছে ক্ষমতার পালাবদল, একটি জাতির জন্ম এবং সময়ের অবিরাম প্রবাহ। অথচ সেই ইতিহাসের সাক্ষী দেয়ালগুলোই এখন কারও কারও ব্যক্তিগত অনুভূতি প্রকাশের জায়গা হয়ে উঠছে।

কেন মানুষ এমন করেন? সামাজিক মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে, কোনো জায়গার সৌন্দর্য ও মহিমায় মুগ্ধ হলে মানুষ সেই অভিজ্ঞতা ধরে রাখতে এবং অন্যদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাইতে পারেন। পরিচিত কোনো স্থানে নিজের উপস্থিতির চিহ্ন রেখে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও কাজ করতে পারে। আহসান মঞ্জিলের চত্বরে পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব থাকলে সেই প্রবণতা আরও সহজে প্রকাশের সুযোগ পায়। দেয়ালে নাম লেখা বা হৃদয়চিহ্ন আঁকার জন্য আলাদা কোনো খরচ নেই, তাৎক্ষণিকভাবে বাধা দেওয়ার ব্যবস্থাও সব সময় দৃশ্যমান নয়। ফলে ক্ষণিকের আবেগ স্থায়ী ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

কিন্তু কোনো স্থানে নিজের উপস্থিতি জানান দেওয়া আর সেই স্থানের ক্ষতি করা এক বিষয় নয়। একটি ছবি ব্যক্তিগত স্মৃতি ধরে রাখতে পারে, অথচ দেয়ালে খোদাই করা নাম অন্য সবার জন্য সংরক্ষিত ঐতিহ্যের ওপর ব্যক্তিগত মালিকানা প্রতিষ্ঠার মতো হয়ে ওঠে। যে প্রাসাদটি অসংখ্য মানুষের ইতিহাস ধারণ করে, সেটিকে নিজের প্রেমকাহিনির পাতায় পরিণত করার অধিকার কারও নেই।

ছবি: সাইফুল্লাহ তাইফ/ টাইমস

বাংলাদেশে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন সংরক্ষণের আইনি ভিত্তিও রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব আইন, ১৯৬৮-এর ১৯ ধারায় সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ধ্বংস, ভাঙা, ক্ষতিগ্রস্ত, বিকৃত কিংবা তাতে আঁকিবুঁকি করা, লেখা বা খোদাই করার ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আইন লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধানও আছে। তবু দেয়ালে নাম ও চিহ্নের উপস্থিতি প্রশ্ন তোলে, আইনের অস্তিত্ব থাকলেও তার প্রয়োগ কতটা কার্যকর।

আরও পড়ুন

শুধু আইন থাকলেই ঐতিহ্য রক্ষা হয় না। প্রয়োজন সুস্পষ্ট নিয়ম, নিয়মিত নজরদারি এবং অনিয়ম শনাক্ত হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা। পর্যাপ্ত কর্মী ও কার্যকর প্রয়োগব্যবস্থা ছাড়া আইনের বিধান কাগজে থাকলেও বাস্তবে তার প্রতিরোধমূলক ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ে। ঐতিহাসিক স্থাপনার সুরক্ষায় তাই কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

ছবি: সাইফুল্লাহ তাইফ/ টাইমস

একই সঙ্গে দর্শনার্থীদের আবেগ প্রকাশের বিকল্প পথও তৈরি করা যেতে পারে। দক্ষিণ কোরিয়ার নামসান টাওয়ারে যুগলরা অর্থের বিনিময়ে কেনা তালায় নিজেদের নাম ও শুভকামনা লিখে তা টাওয়ারের রেলিংয়ে ঝুলিয়ে রাখেন। তালাগুলো সেখানে সম্পর্কের বন্ধনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আহসান মঞ্জিলের ক্ষেত্রে এই ব্যবস্থা সরাসরি প্রয়োগ করা সম্ভব না-ও হতে পারে। তবে পর্যটন ব্যবস্থাপনায় এমন উদ্যোগ থেকে শিক্ষা নিয়ে দর্শনার্থীদের জন্য বিকল্প স্মারক বা অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

যেমন, প্রাসাদের ইতিহাস ও স্থাপত্যের ছবি-সংবলিত পোস্টকার্ড, নির্ধারিত স্মৃতিলেখার খাতা কিংবা ছবি তোলার জন্য বিশেষভাবে সাজানো স্থান দর্শনার্থীদের অভিজ্ঞতাকে আরও অর্থবহ করে তুলতে পারে। এতে মানুষ নিজের স্মৃতি ধরে রাখতে পারবেন, অথচ ঐতিহাসিক স্থাপনাটির গায়ে কোনো দাগ পড়বে না। তবে বিকল্প ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি নিয়ম ভাঙলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।

ছবি: সাইফুল্লাহ তাইফ/ টাইমস

ঐতিহ্য সংরক্ষণের দায়িত্ব কেবল প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের ব্যক্তিগত মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। দেয়ালে আঁকিবুঁকি করা কিংবা যত্রতত্র ময়লা ফেলার মতো কাজগুলোকে অনেকে তুচ্ছ বলে মনে করতে পারেন। কিন্তু অসংখ্য মানুষের এমন ছোট ছোট সিদ্ধান্ত একসময় একটি জায়গার সামগ্রিক চেহারা বদলে দেয়। যে আচরণকে একজন নিরীহ স্মৃতিচিহ্ন মনে করেন, সেটিই অন্যের কাছে হয়ে উঠতে পারে ঐতিহ্যের অবমাননা।

আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কী রেখে যেতে চাই—এই প্রশ্নটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি প্রাসাদ, যার দেয়ালে ইতিহাসের বদলে অসংখ্য অপরিচিত মানুষের নাম ও হৃদয়চিহ্ন ছড়িয়ে থাকবে? নাকি এমন একটি স্থাপনা, যেখানে পরবর্তী প্রজন্মও দেখতে পাবে অতীতের স্থাপত্য, নকশা ও নির্মাণশৈলীর স্বাভাবিক সৌন্দর্য।

আহসান মঞ্জিল কালের সাক্ষী হয়ে ঝড় ও ভূমিকম্পের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগেও টিকে আছে। কিন্তু মানুষের অসচেতন আচরণে তার সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক পরিচয় ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু দীর্ঘকাল দাঁড়িয়ে থাকাই তার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যথেষ্ট হবে না। ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন সঠিক সংরক্ষণ, দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের আন্তরিক সহযোগিতা।

ভালোবাসা প্রকাশের জন্য দেয়ালে নাম খোদাই করার প্রয়োজন নেই। একটি ছবি, একটি পোস্টকার্ড কিংবা ব্যক্তিগত অ্যালবামে রাখা কোনো মুহূর্তও দীর্ঘদিন স্মৃতি হয়ে বেঁচে থাকতে পারে। ক্ষণিকের আবেগের জন্য শত বছরের ঐতিহ্যকে ক্ষতবিক্ষত করার কোনো যুক্তি নেই।

পরেরবার আহসান মঞ্জিলে গেলে ছবি তুলুন, প্রিয়জনের সঙ্গে সময় কাটান, চাইলে একটি পোস্টকার্ড কিনে রাখুন। দর্শনার্থীদের জন্য খাতা থাকলে সেখানে নিজের অনুভূতিও লিখে আসুন। শুধু দেয়ালগুলোকে তাদের মতো থাকতে দিন। যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আহসান মঞ্জিলকে দেখতে পারে তার নিজস্ব সৌন্দর্যে, কারও ক্ষণস্থায়ী ভালোবাসার আঁকিবুঁকিতে ঢাকা পড়ে নয়।

কারণ, ইতিহাসের বুকে ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর স্বাক্ষর হলো তাকে অক্ষত রেখে যাওয়া।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad