রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারে বাবার রাস্তার ধারের চায়ের দোকানে শান্তভাবে বসে ছিল নাজিউর রহমান নিপ্পন। তার গায়ে তেজগাঁওয়ের একটি বেসরকারি স্কুলের লোগো লাগানো আকাশী রঙের শার্ট। পরিবারের আর্থিক অবস্থা সাধারণ হলেও নিপ্পনের শিক্ষার জন্য তার বাবা আমিনুর রহমান বেছে নিয়েছেন ব্যয়বহুল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।
আমিনুর রহমান জানান, ছেলের স্কুলের মাসিক বেতন এক হাজার টাকা। আশেপাশে বেশ কিছু সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও তিনি সেখানে ছেলেকে পাঠাননি। তার মতে, টাকা বাঁচানোর চেয়ে সন্তানের সুশিক্ষা নিশ্চিত করা অনেক বেশি জরুরি।
আমিনুর রহমানের এই সিদ্ধান্ত আসলে দেশের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার একটি বড় চিত্রের প্রতিফলন। রাষ্ট্র বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষা দিলেও অনেক সামর্থ্যবান পরিবার এখন বেসরকারি স্কুলের দিকে ঝুঁকছে। সরকারি স্কুলের শিক্ষার গুণগত মান, শ্রেণিকক্ষের পরিবেশ, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার অভাব এবং সহশিক্ষামূলক কার্যক্রমের ঘাটতি নিয়ে অভিভাবকদের মনে গভীর উদ্বেগ রয়েছে।
অনেক অভিভাবকই আশঙ্কা করেন, সরকারি স্কুলে পড়লে তাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে প্রতিযোগিতামূলক জীবনে পিছিয়ে পড়বে।
আস্থার সংকটে শিক্ষা ব্যবস্থা
শিক্ষাবিদরা সতর্ক করে বলেন, এই প্রবণতা দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাদের মতে, একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার দর্শন গড়ে ওঠে প্রাথমিক পর্যায় থেকে। কিন্তু যদি অধিকাংশ শিক্ষার্থী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তবে সেই দর্শন অকার্যকর হয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকে।
এই পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা সংক্রান্ত পরামর্শক কমিটির প্রধান মনজুর আহমেদ। তিনি বলেন, বর্তমানে যারা দেশ পরিচালনা করছেন তাদের অধিকাংশই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন। কিন্তু এখন সেই স্কুলগুলো শিক্ষার্থী ধরে রাখতে পারছে না।
তার মতে, শিক্ষা ব্যবস্থায় সামগ্রিক পরিকল্পনা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার অভাবেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
শিক্ষকরাও লক্ষ্য করছেন, সরকারি স্কুলে এখন মূলত অতি দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের সন্তানরাই আসছে। নিম্ন-মধ্যবিত্তরা কিন্ডারগার্টেন এবং উচ্চ-মধ্যবিত্তরা ইংরেজি মাধ্যমের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে সমাজের বিভিন্ন স্তরের শিশুদের মধ্যে শৈশব থেকেই এক ধরনের বিভাজন তৈরি হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক খায়রুল চৌধুরী এই পরিস্থিতিকে চরম বিশৃঙ্খলা হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় দর্শন, নীতি এবং জাতীয় উদ্দেশ্যের অভাব রয়েছে। এর ফলে সমাজে ইতোমধ্যে একটি শ্রেণিগত বিভাজন শিকড় গেড়েছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এভাবে মেধাবীদের একটি সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি তৈরি হলেও সামগ্রিকভাবে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা সম্ভব হবে না।
স্কুল বাড়লেও কমছে শিক্ষার্থী
গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী কমে যাওয়ার এক আশঙ্কাজনক চিত্র পাওয়া যায়। ২০২১ সালের তুলনায় শিক্ষার্থী ভর্তির হার ২১ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। ২০১৫ সালে দেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা ছিল ৩৮ হাজার ৩০৬টি এবং শিক্ষার্থী ছিল ৯৫ লাখ ৮০ হাজার। তখন প্রতিটি স্কুলে গড়ে ২৫০ জনের বেশি শিক্ষার্থী পড়ত।
বর্তমানে স্কুলের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫ হাজার ৫৬৯টিতে এবং মোট শিক্ষার্থী এক কোটি ৬ লাখ। কিন্তু স্কুল প্রতি গড় শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৬২ জনে। অর্থাৎ গত এক দশকে ২৭ হাজার স্কুল বাড়লেও শিক্ষার্থী বেড়েছে মাত্র ১০ লাখের মতো। এর ফলে প্রতিটি স্কুলে গড়ে অন্তত ৮৮ জন শিক্ষার্থী কমেছে, যা শতাংশের হিসেবে প্রায় ৩৫ শতাংশ।
শুধুমাত্র ঢাকাতেই সরকারি তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১৬ লাখ প্রাথমিক ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ১৩ লাখই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছে। দেশের অন্যান্য শহরগুলোতেও দেখা যাচ্ছে একই চিত্র। গ্রামাঞ্চলে সরকারি স্কুলের প্রভাব থাকলেও সেখানেও কিন্ডারগার্টেনের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। বর্তমানে ৫৩ হাজারের বেশি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৯৫ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়ছে। বেসরকারি স্কুল প্রতি গড় শিক্ষার্থী সংখ্যা এখন সরকারি স্কুলের চেয়ে বেশি।
বেসরকারি ও ধর্মীয় শিক্ষার বিস্তার
বেসরকারি শিক্ষার প্রসারের সাথে সাথে ধর্মীয় শিক্ষার হারও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান জানান, করোনা মহামারির আগে কিন্ডারগার্টেনগুলোতেিএক কোটির বেশি শিক্ষার্থী ছিল। তবে মহামারির পর অনেক শিক্ষার্থী কওমি মাদ্রাসায় চলে গেছে। শহর ও গ্রাম উভয় অঞ্চলেই এখন মাদ্রাসায় ভর্তির হার বাড়ছে। যদিও কওমি মাদ্রাসার সঠিক শিক্ষার্থী সংখ্যা নিয়ে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য নেই।
মাঠ পর্যায়ের শিক্ষকরা কাজের কঠিন পরিবেশ এবং অভিভাবকদের অনাগ্রহের কথা জানিয়েছেন। ঢাকার বসিলা এলাকার একজন শিক্ষক বলেন, তাদের অধিকাংশ শিক্ষার্থী নিম্ন আয়ের পরিবার থেকে আসে।
অনেক সময় অভিভাবকরা শিক্ষার চেয়ে জীবনধারণের লড়াইয়ে বেশি ব্যস্ত থাকেন। মোহাম্মদপুরের একজন শিক্ষক জানান, অভিভাবকদের নিয়ে মাসিক সভা বা মা সমাবেশ আয়োজন করাও কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক অভিভাবক অপ্রাতিষ্ঠানিক কাজে যুক্ত থাকায় তাদের ফোনেও পাওয়া যায় না।
গাইবান্ধার পলাশবাড়ীর একজন শিক্ষক বলেন, অনেক পরিবারকে খাবার জোগাড় করা এবং সন্তানের পড়ালেখা তদারকি করার মধ্যে যেকোনো একটি বেছে নিতে হয়। এমন পরিস্থিতিতে শিক্ষকদের পক্ষে শিক্ষার ন্যূনতম মান বজায় রাখাই কঠিন হয়ে পড়ে। কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করা সেখানে প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরকারি স্কুলের প্রাক্তনেরাও বিমুখ
আশ্চর্যের বিষয় হলো, যারা নিজেরা সরকারি স্কুলে পড়ে বড় হয়েছেন, তারাও এখন সন্তানদের বেসরকারি স্কুলে পাঠাচ্ছেন। গাইবান্ধা সরকারি কলেজের শিক্ষক আশফাকুল ইসলাম তার দুই সন্তানকে দুটি ভিন্ন বেসরকারি ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে পড়ান। তিনি জানান, সরকারি স্কুলে শৃঙ্খলা ও সঠিক তদারকির অভাবেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সুযোগও তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজের স্নাতক ও বর্তমানে পেশাজীবী চিকিৎসক মাসুদ রহমান তার সন্তানকে ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে ভর্তি করিয়েছেন। তিনি বলেন, ইংরেজি মাধ্যমের পাঠদান পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম আন্তর্জাতিক মানের। কোনো সচেতন অভিভাবকই তার সন্তানের শিক্ষা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে চান না।
তিনি সরকারি স্কুলের শিক্ষকদের দায়বদ্ধতার অভাব এবং ঘন ঘন পাঠ্যক্রম পরিবর্তনকেও দায়ী করেন।
তবে অনেক পরিবারের জন্য খরচ একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মী মো. কবির হোসেন জানান, তিনি তার মেয়েকে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে চেয়েছিলেন কিন্তু খরচের কারণে পারেননি।
তিনি মনে করেন, সরকারি স্কুল যদি শিক্ষার মান এবং সামাজিকীকরণের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারত, তবে সবাই সেখানেই যেত। সামর্থ্য অনুযায়ী বিকল্প খোঁজা মানুষের জন্য স্বাভাবিক বিষয়।
সংস্কারের উদ্যোগ ও ভবিষ্যৎ পথ
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এই ধারা পরিবর্তন করতে হলে পদ্ধতিগত সংস্কার প্রয়োজন। মনজুর আহমেদ উচ্চমানের পাঠ্যক্রম, বিষয়ভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ মমিনূর রশিদ একটি কাঠামোগত সমাধানের প্রস্তাব দিয়েছেন। তিনি বলেন, দেশের সব স্কুলকে একই মানে নিয়ে আসতে হবে। এলাকাভিত্তিক বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে হবে যাতে সব সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার শিশুরা একই স্কুলে পড়ে। এটি করা সম্ভব হলে সমাজের বৈষম্য কমে আসবে।
এই পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, সরকার শিক্ষক প্রশিক্ষণ, জবাবদিহিতা এবং শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, মুখস্থ বিদ্যার পরিবর্তে দক্ষতাভিত্তিক ও ব্যবহারিক শিক্ষার দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সরকার এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা চায় যেখানে শিশুরা শুধু পরীক্ষার জন্য নয় বরং জীবনের জন্য শিখবে। তাদের সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে।
প্রতিমন্ত্রী মনে করেন, শুধু স্কুল ভবন নির্মাণ করলেই হবে না। শ্রেণিকক্ষের ভেতরে শিক্ষার মান উন্নয়ন বেশি জরুরি।
দেশের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা এখন এক কঠিন সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। এক সময় যা সব স্তরের মানুষের মিলনস্থল ছিল, তা এখন কেবল সুবিধাবঞ্চিতদের শেষ ভরসায় পরিণত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি দ্রুত মানসম্মত সংস্কারের মাধ্যমে মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনা না যায়, তবে সবার জন্য সমমানের শিক্ষার প্রতিশ্রুতি অপূর্ণই থেকে যাবে। এতে আরও গভীর হবে সামাজিক বিভাজনের ঝুঁকি।


