চেয়ারম্যান নিয়োগকে ঘিরে টানা আন্দোলন ও আমানতকারীদের মধ্যে নতুন করে তৈরি হওয়া উদ্বেগের মধ্যে মাত্র নয় দিনে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা আমানত হারিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা বিশেষ সহায়তা চেয়েছে ইসলামী ব্যাংক।
মঙ্গলবার ব্যাংকটির প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) স্বাক্ষরিত একটি চিঠি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের কাছে পাঠানো হয়। গ্রাহকদের নগদ অর্থ উত্তোলনের চাপ সামাল দিতে এই সহায়তা চাওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘ইসলামী ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ১০ হাজার কোটি টাকা ধার চেয়েছে। তবে এখনো এই বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি সূত্র জানিয়েছে, গভর্নরসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বিষয়টি পর্যালোচনা করছেন।
ইসলামী ব্যাংকের একাধিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ১ জুন থেকে ৭ জুন পর্যন্ত ব্যাংকটির আমানত কমেছে ৪ হাজার ২০৪ কোটি টাকা। এরপর গত দুই দিনে আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন গ্রাহকেরা। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হিসাবে, ১ জুন থেকে ৯ জুন পর্যন্ত মোট আমানত হ্রাসের পরিমাণ প্রায় ৬ হাজার কোটি ছাড়িয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসলামী ব্যাংকের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা টাইমসকে বলেন, ‘টাকা উত্তোলনের চাপ আরও বেড়েছে। গত দুই দিনেই গড়ে ১ হাজার কোটি টাকা করে আমানত কমেছে। উত্তোলনের চাপ বাড়ায় ব্যাংকটি নগদ অর্থ সংকটে পড়েছে।’
তিনি বলেন, কিছু এটিএম বুথ ও শাখায় গ্রাহকদের চাহিদা অনুযায়ী নগদ অর্থ সরবরাহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঈদের আগে শেষ কর্মদিবসে ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান এম জুবায়দুর রহমান পদত্যাগ করেন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংক মনোনীত স্বতন্ত্র পরিচালক ছিলেন। একই দিন রাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর মো. খুরশীদ আলমকে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এরপর থেকেই ‘সচেতন গ্রাহক ফোরাম’র ব্যানারে নতুন চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিতে দিলকুশায় ইসলামী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের সামনে ও সারা দেশের বিভিন্ন শাখার সামনে ধারাবাহিক কর্মসূচি চলছে। মঙ্গলবারও টানা নবম দিনের মতো প্রধান কার্যালয়ের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালিত হয়।
এদিন পুরুষদের সঙ্গে শতাধিক নারীও আন্দোলনে অংশ নেন। কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া গ্রাহকেরা আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
আন্দোলনকারীদের দাবির মধ্যে রয়েছে সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওমর ফারুক খানকে পুনর্বহাল, ব্যাংকের পর্ষদ থেকে বিতর্কিত ব্যক্তিদের অপসারণ, ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন থেকে ধারা ১৮(ক) বাতিল এবং ব্যাংক লুটপাটের সঙ্গে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা।
এক সময় দেশের সবচেয়ে শক্তিশালী শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক হিসেবে পরিচিত ইসলামী ব্যাংক গত এক দশকে এস আলম গ্রুপের ব্যাপক ঋণ বিতরণ ও নিয়ন্ত্রণ বিতর্কের কারণে গভীর সংকটে পড়ে।
২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর ব্যাংকটি এই বিতর্কিত শিল্প গোষ্ঠীটির নিয়ন্ত্রণমুক্ত হলেও বিপুল খেলাপি ঋণ ও তারল্য সংকট থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের আগে বিভিন্ন ধরনের তারল্য সহায়তা দিয়ে ব্যাংকটিকে সচল রেখেছিল। পরে এটি নিজেরাই ঘুড়ে দাঁড়াচ্ছিল। এর মধ্যেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নতুন সংকটে পড়লো দেশের বেসরকারি খাতের বৃহৎ এই শরিয়াহ ব্যাংকটি।


