চট্টগ্রামের আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যা মামলায় দ্বিতীয় সাক্ষী হিসেবে এক প্রত্যক্ষদর্শী আইনজীবী আদালতে সাক্ষ্য দিয়েছেন। সাক্ষ্য দিতে গিয়ে ঘটনার বিবরণ দেওয়ার সময় তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
সোমবার চট্টগ্রাম বিভাগীয় দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের বিচারক ফজলে খোদা মোহাম্মদ নাজিরের আদালতে এই সাক্ষ্য দেন আইনজীবী শহিদুল আলম রাহাত। পরে তাকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন। তবে মামলার প্রধান আসামি সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের পক্ষে কোনো জেরা করা হয়নি।
রাষ্ট্রপক্ষের সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) মো. রায়হানুল ওয়াজেদ চৌধুরী জানান, শহিদুল আলম রাহাত মামলার দ্বিতীয় সাক্ষী এবং তিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী।
সাক্ষ্যে রাহাত আদালতকে জানান, হত্যাকাণ্ডের দিন ঘটনাস্থলে পৌঁছে তিনি নীল গেঞ্জি ও হেলমেট পরা এক ব্যক্তিকে হাতে বটি নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। তার কিছুটা দূরে ৫০ থেকে ৬০ জন দেশীয় ধারালো অস্ত্র হাতে অবস্থান করছিল। একপর্যায়ে ওই ব্যক্তিরা তাড়া করলে নিহত আইনজীবী আলিফ তাকে পেছন থেকে ডাক দেন। তিনি পেছনে ফিরে দেখেন, বটি হাতে থাকা ব্যক্তি আলিফের ওপর হামলা চালাচ্ছে। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে প্রাণ বাঁচাতে রাহাত সেখান থেকে সরে যান। আদালতে এই ঘটনার বর্ণনা দেওয়ার সময় তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
সাক্ষ্য শেষে অন্য আসামিদের আইনজীবীরা তাকে জেরা করলেও চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের আইনজীবী জেরা করেননি। রাষ্ট্রপক্ষ জানায়, অভিযোগ গঠনের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে উচ্চ আদালতে আবেদন করা হয়েছে উল্লেখ করে চিন্ময়ের পক্ষে সময়ের আবেদন করা হয়। আদালত আবেদন মঞ্জুর করে আগামী ২০ আগস্ট জেরার পরবর্তী তারিখ নির্ধারণ করেন।
এদিন কারাগারে থাকা চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তার জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন। অন্য আসামিদের সশরীরে আদালতে হাজির করা হলে শুনানি শেষে তাদের আবার কারাগারে পাঠানো হয়। বর্তমানে এ মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া ২৭ জন কারাগারে রয়েছেন এবং অপর ১২ জন আসামি এখনো পলাতক।
এর আগে, গত ২০ মে মামলার বাদী ও নিহত আইনজীবীর বাবা জামাল উদ্দিনের সাক্ষ্যগ্রহণ ও জেরা শেষ হয়। চিন্ময়ের পক্ষে বাদীকে জেরা করার জন্য ছয় দফা সময় চাওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত জেরা ছাড়াই তার সাক্ষ্য সমাপ্ত ঘোষণা করেন আদালত। গত ১৯ জানুয়ারি চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ ৩৯ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়।
মামলার বিবরণী থেকে জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন আবেদন নাকচ করে তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন আদালত। এরপর চট্টগ্রাম আদালত প্রাঙ্গণে তার সমর্থকরা প্রিজন ভ্যান ঘিরে বিক্ষোভ শুরু করেন। প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর পুলিশ সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে তাদের ছত্রভঙ্গ করে।
এ সময় বিক্ষোভকারীরা আদালত সড়কে থাকা মোটরসাইকেল ও অন্যান্য যানবাহনে ভাঙচুর চালায়। পরে আইনজীবী ও আদালতের কর্মচারীরা তাদের ধাওয়া দিলে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার মধ্যে রঙ্গম কনভেনশন হল সড়কে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
ঘটনার তিন দিন পর, ২৯ নভেম্বর, নিহতের বাবা জামাল উদ্দিন কোতোয়ালি থানায় ৩১ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত আরও ১৫ থেকে ১৬ জনকে আসামি করে মামলা করেন। তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালি) মাহফুজুর রহমান ৩৮ জনকে আসামি করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্রধান আসামি করা হয়।
তদন্ত কর্মকর্তা অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, জামিন আবেদন নাকচ হওয়ার পর চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের উসকানিমূলক বক্তব্যে তার সমর্থকরা উত্তেজিত হয়ে হামলা চালায়। গ্রেপ্তার আসামিদের জবানবন্দি ও তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাকে হামলার ‘হুকুমদাতা’ হিসেবে প্রধান আসামি করা হয়েছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে হত্যা করা হয়েছিল। পরে গত ৭ জানুয়ারি মহানগর দায়রা জজ মামলাটি বিচারের জন্য চট্টগ্রাম দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠান।


