মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেছেন, কোনো প্রকার জিনেটিক পরিবর্তন না ঘটিয়ে উৎপাদন করা মাংস আগামী তিন বছরের মধ্যে রপ্তানি করবে বাংলাদেশ।
বুধবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) এবং অস্ট্রেলিয়ার চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির (সিএসইউ) যৌথ উদ্যোগে এক সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে তিনি এসব কথা বলেন।
অস্ট্রেলিয়া সরকারের ডিপার্টমেন্ট অব ফরেন অ্যাফেয়ার্সের অর্থায়নে ‘অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ রিসার্চ শোকেস’ শিরোনামে সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। এর মূল প্রতিপাদ্য ছিল ‘জলবায়ু সহনশীল খাদ্য ব্যবস্থা-ব্যবহারিক সমাধান ও অংশীদারত্ব।’
মন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে নিরাপদ খাদ্য ও নিউট্রেশনাল ফুড খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। জেনেটিক মোডিফাইড ফুড পৃথিবীকে কল্যাণের দিকে নিয়ে যেতে পারেনি। গবেষণার মাধ্যমে নেপিয়ার ঘাসের এমন এক পদ্ধতি উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা ১৮% শতাংশ প্রোটিন সম্পন্ন।
তিনি আরও বলেন, গবাদিপশুর জন্য উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ ও খরা-সহিষ্ণু ঘাস উদ্ভাবন প্রাণিসম্পদ খাতে এক যুগান্তকারী অগ্রগতি, যা স্বল্প ব্যয়ে উন্নতমানের প্রাণিখাদ্য উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এর ফলে মাংস উৎপাদন ব্যয় কমবে এবং সাধারণ মানুষের জন্য মাংসের দামও তুলনামূলকভাবে সহনীয় পর্যায়ে আনা সম্ভব হবে।
মন্ত্রী গবেষক ও বিজ্ঞানীদের উদ্দেশ্যে বলেন, দেশের কল্যাণে স্বাধীনভাবে গবেষণা ও উদ্ভাবনী কাজের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বাংলাদেশি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবন আগামী দিনে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে স্বীকৃতি পাবে এবং দেশের প্রাণিসম্পদ ও কৃষি খাতকে আরও সমৃদ্ধ করবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, গবাদিপশুর খাদ্য উৎপাদন ব্যয় কমানো গেলে মাংস উৎপাদনের খরচও কমবে এবং তা ভোক্তাদের কাছে তুলনামূলক সাশ্রয়ী মূল্যে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হবে। কম খরচে উন্নতমানের ঘাস ও প্রাণিখাদ্য উৎপাদন নিশ্চিত করতে গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, স্বাধীন চিন্তা, গবেষণা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন, যাতে গবেষকরা দেশের কল্যাণে কার্যকর অবদান রাখতে পারেন। তিনি আরও বলেন, গণতান্ত্রিক সমাজে মতভিন্নতা স্বাভাবিক হলেও যোগ্যতা, দক্ষতা ও দেশপ্রেমকে মূল্যায়ন করে দেশের উন্নয়নে কাজ করাই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য।
বিএলআরআইয়ের মহাপরিচালক শাকিলা ফারুকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত অস্ট্রেলিয়ার ডেপুটি হাই কমিশনার ক্লিনটন পবকি উপস্থিত ছিলেন। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. শাহজামান খান।
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন বিএলআরআইয়ের পরিচালক (গবেষণা) মো. জিল্লুর রহমান এবং চার্লস স্টার্ট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও গুলবালি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের উপপরিচালক ক্যামেরন ক্লার্ক।
সেমিনারে পরিবেশবান্ধব ও স্বল্প ব্যয়ী গরুর মাংস উৎপাদন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা এবং টেকসই প্রাণিসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ‘এনভায়রনমেন্টালি সাসটেইনেবল লো-কস্ট বিফ প্রোডাকশন-প্র্যাকটিক্যাল সলুশনস অ্যান্ড পার্টনারশিপ” শিরোনামে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিএলআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও প্রকল্প সমন্বয়কারী মোহাম্মদ খায়রুল বাশার।
প্রবন্ধে প্রাণিসম্পদ খাতে গ্রিনহাউস গ্যাস ও মিথেন নিঃসরণ হ্রাসে করণীয় বিষয়ও তুলে ধরা হয়।
গবেষকদের মতে, উন্নত খাদ্য ব্যবস্থাপনা, সবুজ ঘাস উৎপাদন বৃদ্ধি, বায়োগ্যাস প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কার্বন ব্যালেন্সিং পদ্ধতি প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব প্রাণিসম্পদ খাত গড়ে তোলা সম্ভব।
মূল প্রবন্ধের ওপর উন্মুক্ত আলোচনায় সেমিনারে উপস্থিত অতিথিরা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় টেকসই ও স্বল্প খরচে প্রাণিসম্পদ উৎপাদন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সেমিনারে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, গবেষক, শিক্ষাবিদ, নীতিনির্ধারক, প্রাণিসম্পদ খাতের পেশাজীবী, উন্নয়ন সহযোগী, বিএলআরআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এবং খামারিরা অংশ নেন।


