চাঁদাবাজি, ধর্ষণ ও হত্যার মতো অপরাধের অভিযোগ ওঠা নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথা ভাবছে বিএনপি। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার ও সংগঠনকে নতুনভাবে সাজাতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন দলটির কয়েকজন শীর্ষ নেতা।
দলের ভেতরেই নতুন করে এসব বিষয় গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। কারণ দলটির নীতিনির্ধারকরা মনে করছেন, সম্প্রতি ঢাকা ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছাত্রদলের যে হতাশাজনক পরাজয় তার পেছনে এসব অভিযোগের যোগসূত্র রয়েছে।
গত বছর আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকেই তৃণমূল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে বিএনপি। বারবার সতর্কবার্তা দেওয়ার পরও এবং নানা ধরনের শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলেও পরিস্থিতি সামলানো যায়নি।
বৃহস্পতিবার এক ফেসবুক পোস্টে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান জানান, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও অসদাচরণের অভিযোগে সাত হাজারেরও বেশি নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তিনি লিখেছেন, ‘কেউ পদচ্যুত হয়েছেন, কেউ বহিষ্কৃত হয়েছেন। বহুমুখী প্রচারণার মধ্যে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ ছিল না, তবে প্রয়োজনীয় ছিল।’
সারাদেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, সহিংসতা, ভূমি দখল এমনকি হত্যার অভিযোগও আসছে। তাদের এসব কর্মকাণ্ড দলের বিশ্বাসযোগ্যতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।
দেশের অনেক স্থান থেকেই স্থানীয় বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কোন্দল, এলাকা দখল নিয়ে প্রতিপক্ষের সঙ্গে লড়াই এবং নেতৃত্ব ধরে রাখতে স্থানীয় কর্মীদের ওপর প্রভাব বজায় বা আধিপত্য বিস্তারে নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের খবর আসছে।
বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অসদাচরণের অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং অভিযুক্ত কর্মীদের বিরুদ্ধে দল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিচ্ছে।’
‘দেখুন, বিএনপি একটি বৃহৎ দল, স্বাভাবিকভাবেই কিছু সদস্য এমন কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়তে পারে। তবে আমরা কাউকে ছাড় দিচ্ছি না এবং সদস্যদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নেতা তারেক রহমান দেশের মঙ্গলের জন্য সামগ্রিক কাঠামো পরিবর্তনের জন্য কাজ করছেন, আমরাও তার দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে সংগঠনের কার্যক্রমে সামঞ্জস্য আনছি।’
বেসরকারি সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) জানিয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীদের ৬৭টি সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এতে আহত হয়েছেন ৭৫৯ জন এবং নিহত হয়েছেন ১৫ জন।
একই সময়ে, দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের ১৯৪টি ঘটনায় ২ হাজার ১৫১ জন আহত এবং ৪৬ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া পুলিশের সঙ্গে দুটি সংঘর্ষে ২৪ জন আহত হয়েছেন।
বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন বলেন, বিভিন্ন স্তরের নেতাদের সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘আমরা দলকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে কাজ করছি, প্রয়োজন হলে কাউকে সংশোধনের সুযোগ দিচ্ছি, প্রয়োজন হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিচ্ছি। অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকলে কাউকেই দলের কোনো পর্যায়ে পদ ধারণ করতে দেওয়া হবে না।’
তারেক রহমান দেশের বাইরে বসবাস করায় তৃণমূল কর্মীদের ওপর তিনি যথেষ্ট নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে খোকন বলেণ, ‘এটা ঠিক যে শারীরিক উপস্থিতি থাকলে নেতাকর্মীদের ওপর তার প্রভাব আরও শক্তিশালী হতো।’
তিনি আরও বলেন, ‘তবে আমি মনে করি নেতা কোথায় অবস্থান করছেন সেটা নেতৃত্বে খুব একটা প্রভাব ফেলে না। তারেক রহমানের কথার বাইরে কেউ যেতে পারে না।’
দেশের সবচেয়ে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বর্তমানে বিএনপিকেই বিবেচনা করছেন বিশ্লেষক ও সমালোচকরা। স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির কর্মকাণ্ড রয়েছে ‘আঁতশ কাঁচের’ নিচে।
দলটির নেতারা বারবার বলছেন, তারেক রহমান সংগঠনের ভাবমূর্তি পুনর্গঠনে এবং একটি সুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে কাজ করছেন।
তবে সহিংসতা, খুন, ভূমি দখল ও চাঁদাবাজির মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বারবার তার এই প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘গণমুখী দল হিসেবে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ—উভয়ের সদস্যপদ নীতিমালা কঠোর নয়।’
তিনি উল্লেখ করেন, বহিষ্কার করলেও প্রায়ই সেটা কার্যকর হয় না। কারণ বহিষ্কার হওয়া ঠিকই স্থানীয় পর্যায়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে প্রভাবশালী হিসেবে রয়ে যান এবং নির্বাচনের সময় দলের হয়েও কাজ করেন।
এই বিশ্লেষকের মতে, এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের একমাত্র উপায় হলো আইনকে স্বাধীনভাবে চলতে দেওয়া।
তিনি টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘যখন দলগুলো নিজেদের সদস্যদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তার বন্ধ করবে, তখনই কেবল কর্মীদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখা যাবে।’


