গুম, আটক, নির্যাতন ও হত্যার দায়ে অভিযুক্ত বর্তমান ও সাবেক সেনা সদস্যদের গ্রেপ্তারে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সহায়তা করতে সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের সহযোগিতা চেয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বৃহস্পতিবার ট্রাইব্যুনালের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নামে জারি হওয়া গ্রেপ্তারি পরোয়ানার অনুলিপি পাঠানো হয় সেনাপ্রধানের কাছে।
পরোয়ানার অনুলিপি সেনাপ্রধানের কাছে পাঠানোর বিষয়টি টাইমস অব বাংলাদেশকে নিশ্চিত করেছেন ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর (প্রশাসন) গাজী এমএইচ তামিম।
এর আগে বুধবার ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন মামলায় ২৫ জন উচ্চ ও মধ্যপদস্থ বর্তমান ও অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়। একই সঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়।
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল ও শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের নামও এসব মামলায় রয়েছে।
আসামিদের মধ্যে কেবল সাবেক মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান কারাগারে রয়েছেন।
জিয়াউল আহসান র্যাবের গোয়েন্দা শাখার অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। শেখ হাসিনার পতনের ১০ দিন পর ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট ঢাকায় গ্রেপ্তার হওয়ার আগে তিনি ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টারের (এনটিএমসি) মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
এমএইচ তামিম বলেন, ‘সাধারণত গ্রেপ্তারি পরোয়ানা পুলিশ মহাপরিদর্শকের কাছে পাঠানো হয়। তবে, যেহেতু এই মামলাগুলোয় বেশ কয়েকজন কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা জড়িত, তাই এসব তথ্য জানাতে ট্রাইব্যুনাল সেনাপ্রধানের কাছে একটি অনুলিপি পাঠিয়েছে। যাতে পুলিশ এই কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তারে তাদের (সেনাবাহিনীর) সহযোগিতা পেতে পারে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হওয়া ব্যক্তিদের অবশ্যেই গ্রেপ্তার করে ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হবে পুলিশকে। এটাই আইনের প্রয়োগ। কেউ যদি গ্রেপ্তার করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা আদালত অবমাননা হিসাবে বিবেচিত হবে।’
ট্রাইব্যুনাল সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অভিযুক্ত পাঁচ থেকে ছয়জন কর্মরত সেনা কর্মকর্তাকে কয়েক মাস ধরে গৃহবন্দী রাখা হয়েছে। কিন্তু কেন তাদের গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না সে কারণটি স্পষ্ট নয়। ট্রাইব্যুনালের এই আদেশ এখন তাদের গ্রেপ্তারের পথ খুলে দিল।
সেনা কর্মকর্তাদের গ্রেপ্তার না করার বিষয়ে পুলিশের ওপর কোনো চাপ আছে কিনা জানতে চাইলে প্রসিকিউটর তামিম বলেন, ‘আমাদের কাছে এমন কোনো তথ্য নেই।’
ট্রাইব্যুনালের আরেকজন প্রসিকিউটর এবং বিশেষ তদন্ত কর্মকর্তা তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদেরকে কয়েক মাস ধরেই নজরদারিতে রাখা হয়েছিল, কিন্তু ছাড়পত্রের অভাবে তাদের গ্রেপ্তার করা যাচ্ছিল না। ট্রাইব্যুনাল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করায় এখন এই কর্মকর্তাদের যেকোনো সময় গ্রেপ্তার করা যেতে পারে।’
গ্রেপ্তারি পরোয়ানার অনুলিপি অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছেও পাঠানো হয়েছে।
সেনাবাহিনীর কয়েকটি সূত্র টাইমসকে জানিয়েছে, যেহেতু কর্মরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তাই সামরিক আইন অনুযায়ী এখন তাদের নিজ নিজ সদর দপ্তরে ডাকা হবে। বাকি কার্যক্রম নিয়ম অনুযায়ী চলবে।
এর আগে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন সদস্যের বেঞ্চ শেখ হাসিনা সরকারের ১৫ বছরের শাসনামল এবং জুলাই অভ্যুত্থানের সময়কার গুম, আটক, নির্যাতন ও হত্যার সঙ্গে জড়িত ২৫ জন বর্তমান ও সাবেক সেনাকর্মকর্তাসহ মোট ২৮ জনের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ আমলে নেয়। এদের বিরুদ্ধে তিনটি মামলা রয়েছে।
এ বিষয়ে শুনানির জন্য ২২ অক্টোবর দিন ধার্য রয়েছে। অর্থাৎ ওইদিনই অভিযুক্তদের ট্রাইব্যুনালে হাজির করতে হবে।
কোন মামলায় কে অভিযুক্ত
শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে গুম, আটক এবং নির্যাতনের দুটি মামলায় মোট ২৮ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
তাদের মধ্যে পাঁচজন বেসামরিক ব্যক্তি এবং ২৩ জন কর্মরত ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা। বেসামরিক ব্যক্তিরা হলেন: শেখ হাসিনা, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সাবেক মহাপরিচালক হারুন-অর-রশিদ এবং খুরশিদ হোসেন।
দুটি মামলাতেই শেখ হাসিনার সাবেক প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল তারিক আহমেদ সিদ্দিককে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
মামলায় অভিযুক্ত বেশিরভাগ সেনা কর্মকর্তা প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং র্যাব-এ কর্মরত ছিলেন।
অভিযুক্ত পাঁচ সাবেক ডিজিএফআই প্রধান হলেন–লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. আকবর হোসেন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী, মেজর জেনারেল (অব.) মো. সাইফুল আবেদিন এবং মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
অন্য অভিযুক্তদের মধ্যে কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ইন্টেলিজেন্স ব্যুরোর সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ মো. সরওয়ার হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবির আহমেদ, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুবুর রহমান সিদ্দিক এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভীর মাজহার সিদ্দিকের নাম রয়েছে।
এছাড়া ডিজিএফআইয়ের সাবেক কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মোখসুরুল হক-এর নামও রয়েছে।
এছাড়াও, গুম ও নির্যাতনের দুটি মামলার আসামির তালিকায় রয়েছেন কর্নেল (অব.) আনোয়ার লতিফ খান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাহাঙ্গীর আলম, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল তোফায়েল মোস্তফা সরোয়ার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কামরুল হাসান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. মাহবুব আলম, কর্নেল কে এম আজাদ, কর্নেল আবদুল্লাহ আল মোমেন, লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ খাইরুল ইসলাম, লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. মশিউর রহমান জুয়েল, লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম সুমন এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল সরোয়ার বিন কাসেম।
তিন নম্বর মামলা অর্থাৎ জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রামপুরায় ২৮ জনকে হত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অভিযুক্তরা হলেন–বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেদওয়ানুল ইসলাম, মেজর রাফাত বিন আলম মুন, ডিএমপি’র খিলগাঁও বিভাগের সাবেক সহকারী উপকমিশনার মো. রাশেদুল ইসলাম এবং রামপুরা থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মশিউর রহমান। এই দুই পুলিশ কর্মকর্তাই পলাতক রয়েছেন।


