অধিগ্রহণের আগে ফসলি জমিতে তোলা হচ্ছে শত শত ভবন 

অধিগ্রহণের আগে ফসলি জমিতে তোলা হচ্ছে শত শত ভবন 
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির সম্প্রসারণের জন্য চিহ্নিত ফসলি জমিতে গড়ে উঠেছে শত শত বহুতল ভবন। এসব ভবন নির্মাণে অনুমোদন নেওয়া হয়েছে কি না, ভবিষ্যতে অধিগ্রহণের সময় কারা ক্ষতিপূরণ পাবেন এবং নির্মাণের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা খনি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটি মৌজায় সরেজমিনে দেখা যায়, কৃষিজমির মধ্যে তিন থেকে চারতলা পর্যন্ত বেশ কিছু ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অনেক ভবন জনশূন্য এবং কয়েকটির প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। অধিকাংশ স্থাপনায় পাকা সড়ক, ড্রেনেজসহ নাগরিক সুবিধা নেই।

হামিদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রেজওয়ানুল হক বলেন, বাঁশপুকুর ও কাজীপাড়ায় প্রায় ১৫০টি এবং চৌহাটিতে প্রায় ৫০টি, অর্থাৎ প্রায় ২০০টি ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০ থেকে ৫০টির হোল্ডিং রয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে এসব নির্মাণ চলছে।

তবে উপজেলা প্রকৌশলী মো. মানিক মিঞা বলেন, এসব এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের অনুমতির জন্য কেউ আবেদন করেননি। বর্তমানে নির্মাণকাজ বন্ধ রয়েছে।

ইউনিয়ন পরিষদের সচিব সাজেদুর রহমান বলেন, নিয়ম না মেনে নির্মিত ভবনগুলোর হোল্ডিং ট্যাক্স বা নিবন্ধন করা হয়নি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবিষ্যতে জমি অধিগ্রহণের সময় বেশি ক্ষতিপূরণ পাওয়ার আশায় অনেকে অনুমোদন ছাড়াই কৃষিজমিতে ভবন নির্মাণ করেছেন। কিছু খনি কর্মকর্তা-কর্মচারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে যাচাই করা কোনো নথি পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, সার্ভের সময় খনির ২২ কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগগুলো তদন্ত করে যাচাই করা হবে।

আরও পড়ুন

বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের (বিসিএমসিএল) তথ্য অনুযায়ী, খনি সম্প্রসারণের জন্য উত্তর পাশে ৩০০ একর জমি অধিগ্রহণের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয় ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর। পরে ২০২৬ সালের ২০ মে পূর্ব-দক্ষিণ পাশে আরও ১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের অনুমোদন দেওয়া হয়। সব মিলিয়ে প্রায় ৩০১ দশমিক ৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, সম্প্রসারণের জন্য জরিপ ও সার্ভের কাজ চলছে। ছয়টি বোরহোল করে ভূ-তাত্ত্বিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। পরবর্তী ফেইস ডেভেলপমেন্টের জন্য নকশা তৈরি করে জেলা প্রশাসনের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

পার্বতীপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. মাহমুদ হুসাইন রাজু বলেন, ভবন নির্মাণ নিয়ে এলাকাবাসীর অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব ভবন নির্মাণে বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়নি। সংশ্লিষ্ট এলাকায় খাজনা গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ তদন্ত করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

বিসিএমসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শাহ আলম বলেন, সম্প্রসারণ এলাকার বাঁশপুকুর, কাজীপাড়া ও চৌহাটিতে অধিগ্রহণের আগে বহুতল ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। খনির কোনো কর্মকর্তা সেখানে ভবন নির্মাণ করেছেন এমন প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে খনি কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, ১৯৯৩ থেকে ২০০৭ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে খনির প্রয়োজনে ৭৯২ দশমিক ৭৫ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, এর আগে খনি এলাকার ১৩টি গ্রাম থেকে কৃষিজমি, বসতবাড়ি ও বিভিন্ন স্থাপনা মিলিয়ে আরও ৬৬৭ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল।

জেলা প্রশাসনের এলএ শাখা সূত্র জানায়, স্থাবর সম্পত্তি অধিগ্রহণ ও হুকুম দখল আইন, ২০১৭ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মৌজায় জমি বিক্রির গড় মূল্য বিবেচনায় নিয়ে অধিগ্রহণ করা জমি ও স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হবে।

হামিদপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জাহেদুজ্জামান বলেন, ইউনিয়নের ২৮টি মৌজায় ৯ হাজার ৫০২ একর কৃষিজমি রয়েছে। অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণে কৃষিজমি কমছে।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাজিব হুসাইন বলেন, কৃষিজমিতে অপরিকল্পিত বহুতল ভবন নির্মাণে উর্বর জমি নষ্ট হচ্ছে, যা উদ্বেগজনক।

স্থানীয়দের দাবি, অধিগ্রহণের আগে নির্মিত ভবনগুলোর মালিকানা, নির্মাণ অনুমোদন, জমির শ্রেণি ও প্রকৃত মালিকানা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। একই সঙ্গে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তারা।

 

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad