চট্টগ্রাম নগরের নাসিরাবাদ অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতার নিয়ম লঙ্ঘন করে ১৮ নম্বরে থাকা এক সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ দায়িত্ব দেওয়ার পেছনে কয়েক লাখ টাকার লেনদেন ও রাজনৈতিক প্রভাব কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরা। এ ছাড়া এডহক কমিটির বিরুদ্ধে নিয়োগ, প্রশাসনিক ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে।
বিদ্যালয়ের নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১৫ জুন পরিচালনা পর্ষদের সভায় নেওয়া সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে একটি নোটিশ জারি করা হয়। তৎকালীন সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম চৌধুরীর স্বাক্ষরিত ওই নোটিশে বলা হয়, ১৬ জুন থেকে সহকারী শিক্ষক কাজী সুলতানা ইয়াসমিন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব পালন করবেন।
তবে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জ্যেষ্ঠতার তালিকায় কাজী সুলতানা ইয়াসমিনের অবস্থান ১৮ নম্বরে। তার চেয়ে জ্যেষ্ঠ ১৭ জন শিক্ষককে বাদ দিয়ে তাকে এ দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি বিধিমালা ও জ্যেষ্ঠতার নীতি উপেক্ষা করে তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এমনকি আগে তার সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতাও ছিল না।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান (স্কুল ও কলেজ) এর জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২৫’-এর ১৩ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং এ-সংক্রান্ত প্রচলিত পরিপত্র অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য হলে প্রথমে সহকারী প্রধান শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিতে হবে। সহকারী প্রধান শিক্ষক না থাকলে বা দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশ করলে বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকদের উচ্চতর গ্রেড ও পারস্পরিক জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে জ্যেষ্ঠতম সহকারী শিক্ষককে এ দায়িত্ব দিতে হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক স্মারক অনুযায়ীও জ্যেষ্ঠতার নিয়ম অনুসরণের বাধ্যবাধকতা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন। তাদের দাবি, এসব বিধান উপেক্ষা করে কনিষ্ঠ কোনো শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হলে তা বিধিবহির্ভূত হবে।
তবে দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্তের পক্ষে ব্যাখ্যা দিয়েছেন তৎকালীন সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, তার আগের সভাপতির মেয়াদে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয়েছিল। এতে অংকুর স্কুলের তিনজন শিক্ষক অংশ নিলেও কেউ উত্তীর্ণ হতে পারেননি। একজন পুরুষ শিক্ষক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। কিন্তু বালিকা বিদ্যালয় হওয়ায় তৎকালীন সভাপতি তাকে নিয়োগ দেননি।
জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র ও বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি আ জ ম নাসির উদ্দীন ও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কবিতা চৌধুরীর সময়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য একটি পরীক্ষা নেওয়া হয়। এতে কাজী সুলতানা ইয়াসমিন, শাহীন আকতার এবং ফেরদৌস পারভীন পরীক্ষায় অংশ নেন। ১০০ নম্বরের মধ্যে নেওয়া পরীক্ষা নেওয়া হলেও কাজী সুলতানা ২২ নম্বর, শাহীন আকতার ২১ নম্বর এবং ফেরদৌস ৫ নম্বর পেয়ে ফেল করেন।
শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক কবিতা চৌধুরীর বয়স ৬০ বছর অতিক্রম করায় শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশনা অনুযায়ী তাকে আর দায়িত্বে রাখা সম্ভব হয়নি। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে যোগ্য সহকারী শিক্ষক না থাকায় পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ফেল করা শিক্ষকদের মধ্যে প্রাপ্ত নম্বর বিবেচনায় কাজী সুলতানা ইয়াসমিনকে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।
জানা গেছে, নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে সাবেক প্রধান শিক্ষক সরোজ কুমারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করেন শিক্ষকরা। এসময় তার কক্ষে তালাও লাগানো হয়। পরে তাকে সরিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেয়া হয় কবিতা চৌধুরীকে। এর আগে তিনি সহকারী প্রধান শিক্ষকের দায়িত্বে ছিলেন। সে অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই তাকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। পরে সহকারী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা নেওয়া হলেও কাউকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি।
বিদ্যালয়ের এডহক কমিটির এখতিয়ার ও কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাদের অভিযোগ, কমিটির দায়িত্ব মূলত নিয়মিত শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান এবং দৈনন্দিন প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার মধ্যে সীমাবদ্ধ। কিন্তু এ সীমার বাইরে গিয়ে কমিটি বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের অভিযোগ, নিয়ম না মেনে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া, পে-স্কেল ও অভ্যন্তরীণ গ্রেড নির্ধারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া বড় ধরনের আর্থিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার না থাকলেও হিসাবরক্ষক ইমরান হোসেনের যোগসাজশে বিভিন্ন কাজ সম্পন্ন হচ্ছে। এসব কার্যক্রমের বিস্তারিত হিসাব ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও হিসাবরক্ষকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাদের।
এবিষয়ে জানতে হিসাবরক্ষক ইমরান হোসেনকে কল দেওয়া হলে সাংবাদিক পরিচয় পেয়ে সংযোগ কেটে দেন।
এদিকে বিদ্যালয়টিতে শিক্ষক নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, গত বছর এডহক কমিটির মাধ্যমে পাঁচজন সহকারী শিক্ষককে কোনো ধরনের লিখিত নিয়োগ পরীক্ষা ছাড়াই মৌখিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে একজন অভিভাবক প্রতিনিধি রাশেদ কামালের ভাগনি, একজন সাবেক সভাপতি শহিদুল ইসলাম চৌধুরীর আত্মীয়, একজন তার আরেক ব্যক্তিগত সহকারী (এপিএস) জিসানের ভাবি এবং একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজী সুলতানা ইয়াসমিনের আত্মীয় রয়েছেন।
এ বিষয়ে শহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, তার দায়িত্বে থাকার সময় পাঁচজন শিক্ষককে অস্থায়ী ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। লিখিত পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব না হওয়ায় অন্য একটি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির মাধ্যমে মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে তাদের নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা স্থায়ীভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত নন। যেকোনো সময় তাদের চাকরি চলে যেতে পারে এবং তাদের বেতনও কম।
গত ১২ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়টির নতুন এডহক কমিটি দায়িত্ব গ্রহণ করে। চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমানকে এ কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে তার হুয়াট্স অ্যাপে কল ও খুদে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এদিকে বিদ্যালয়ে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিয়োগসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার আফরোজা আক্তার জ্যেষ্ঠ শিক্ষক রওশন আক্তারের পক্ষে একটি রিট আবেদন করেছেন।
বিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকদের দাবি, প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন আর্থিক খাতের লেনদেন ও ব্যয়ের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া প্রয়োজন। তাদের অভিযোগ, জ্যেষ্ঠতার নীতিমালা অনুযায়ী ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের সময়সীমা ছয় মাসের বেশি হওয়ার কথা নয়। অথচ কাজী সুলতানা ইয়াসমিন এক বছরের বেশি সময় ধরে এ দায়িত্ব পালন করছেন।
শিক্ষকদের ভাষ্য, এতজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষক থাকার পরও তাদের একজন কনিষ্ঠ শিক্ষকের অধীনে কাজ করতে হচ্ছে। এতে তাদের পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক শৃঙ্খলাও ব্যাহত হচ্ছে।
তাদের দাবি, দ্রুত বিধি অনুযায়ী যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে। স্থায়ী নিয়োগপ্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত জ্যেষ্ঠতার নীতি অনুসরণ করে মাধ্যমিক শাখার জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব দিতে হবে।
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজী সুলতানা ইয়াসমিনের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বিদ্যালয়ে গিয়ে কথা বলতে বলেন। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য দিতে আগ্রহ দেখাননি।
১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষক শিক্ষিকা ৫৮ জন এবং পাঁচ হাজারের অধিক শিক্ষার্থী রয়েছে। প্লে শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত শ্রেণি কার্যক্রম চলছে।


