২০২৬ সালে বৈশ্বিক পণ্যের দাম ছয় বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসবে বলে জানিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এই পূর্বাভাস সত্যি হলে, এটি টানা চতুর্থ বছরের মতো দাম কমার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সর্বশেষ কমোডিটি মার্কেটস আউটলুক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ ও ২০২৬ সালে বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম গড়ে সাত শতাংশ করে কমবে। বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্থর প্রবৃদ্ধি, তেলের উদ্বৃত্ত মজুদ বাড়া এবং নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে এ পতন ঘটবে।
বিশ্বব্যাংক বলছে, জ্বালানির দাম কমতে থাকায় বিশ্বব্যাপী মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা কমছে। কমদামি চাল ও গম অনেক উন্নয়নশীল দেশের খাদ্যব্যয় কমাতে সহায়তা করছে। তবে, দাম কমলেও এখনও তা মহামারির আগের স্তরের চেয়ে বেশি থাকবে।
২০২৫ সালে দাম ২০১৯ সালের তুলনায় ২৩ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে ১৪ শতাংশ বেশি থাকবে বলে ধারণা করা হয়েছে।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রধান অর্থনীতিবিদ ও উন্নয়ন অর্থনীতির সিনিয়র সহ-সভাপতি ইন্দরমিত গিল বলেন, ‘পণ্যবাজার বৈশ্বিক অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। যদিও জ্বালানির দাম কমায় বিশ্বব্যাপী ভোক্তা পর্যায়ের মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা প্রশমিত হয়েছে। কিন্তু এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। এই সুযোগে সব দেশের সরকারের উচিত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা ঠিক করা, ব্যবসাবান্ধব অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করা।’
২০২৫ সালে বৈশ্বিক তেল উদ্বৃত্ত উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০২৬ সালে এটি ২০২০ সালের সর্বশেষ উচ্চমাত্রার তুলনায় ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং চীনে তেল খরচ স্থবির হয়ে পড়া। বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড যানবাহনের চাহিদা বৃদ্ধির ফলে তেলের চাহিদা ধীরে কমছে। পাশাপাশি চীনে তেল ব্যবহারের স্থবিরতাও এর প্রভাব ফেলছে।
অপরিশোধিত ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ২০২৫ সালে গড়ে ৬৮ ডলার থেকে ২০২৬ সালে কমে ৬০ ডলারে নামবে বলে ধারণা করা হয়েছে। যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। সামগ্রিকভাবে জ্বালানির দাম ২০২৫ সালে ১২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে আরও ১০ শতাংশ কমবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
খাদ্যদ্রব্যের দাম ২০২৫ সালে ৬ দশমিক ১ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে আরও শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ কমতে পারে। রেকর্ড উৎপাদন ও বাণিজ্য বিঘ্নের কারণে ২০২৫ সালে সয়াবিনের দাম কমবে, যদিও পরের বছর স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।
কফি ও কোকোর দাম ২০২৬ সালে কমবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। কারণ বৈশ্বিক সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হবে। তবে সার বা ফার্টিলাইজারের দাম ২০২৫ সালে ২১ শতাংশ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যা কৃষকদের লাভের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারে। তবে, আগামী বছর দাম ৫ শতাংশ কমতে পারে।
উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞার কারণে সার বা সারজাত পণ্যের দাম ২০২৫ সালে ২১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে বলে আশা করা হচ্ছে। যদিও ২০২৬ সালে তা পাঁচ শতাংশ কমার সম্ভাবনা রয়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধি কৃষকদের মুনাফা আরও কমিয়ে ফসল উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে পারে।
অন্যদিকে, স্বর্ণ ও রুপার মতো মূল্যবান ধাতুর দাম রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। ২০২৫ সালে স্বর্ণের দাম ৪২ শতাংশ এবং ২০২৬ সালে আরও পাঁচ শতাংশ বাড়তে পারে। রুপার দামও একইভাবে ২০২৫ সালে ৩৪ শতাংশ ও ২০২৬ সালে আরও আট শতাংশ বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক টানাপোড়েন ও নীতিগত অনিশ্চয়তার কারণে স্থবির থাকলে পণ্যমূল্য পূর্বাভাসের চেয়ে আরও নিচে নামতে পারে।
ওপেক প্লাস দেশগুলোর প্রত্যাশার চেয়ে বেশি তেল উৎপাদন হলে তেলের উদ্বৃত্ত আরও বাড়তে পারে, যা জ্বালানির দামের ওপর অতিরিক্ত চাপ ফেলবে। ২০৩০ সালের মধ্যে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিক্রি দ্রুত বৃদ্ধি পেলে তেলের চাহিদা আরও কমবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) দ্রুত সম্প্রসারণ এবং ডেটা সেন্টার পরিচালনার জন্য বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় শক্তি ও বেস মেটাল যেমন-অ্যালুমিনিয়াম ও তামার দামও বাড়তে পারে।
বিশ্বব্যাংকের ডেপুটি চিফ ইকোনমিস্ট ও প্রসপেক্টস গ্রুপের পরিচালক আয়হান কোসে বলেন, ‘তেলের দাম কমে যাওয়া উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি বড় সুযোগ। এখনই সময় জ্বালানি ভর্তুকি কমিয়ে উৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর।’
বিগত সময়ে আন্তর্জাতিক পণ্যচুক্তি বা কোটার মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখার চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘমেয়াদি সমাধান দিতে পারেনি। তাই দেশগুলো যেন মূল্য নিয়ন্ত্রণের বদলে প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বাজারভিত্তিক মূল্যনীতি গ্রহণ, ভবিষ্যতে দামের অস্থিরতা মোকাবেলার জন্য স্থিতিশীলতা গড়ে তুলতে প্রতিবেদনে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।


