দু’দিন বন্ধ থাকার পর জনরোষ, রাজনৈতিক চাপ এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপে সন্দ্বীপ-চট্টগ্রাম রুটে আবার স্পিডবোট চলাচল শুরু হয়েছে। বুধবার থেকে সরকার নির্ধারিত ২৬০ টাকা ভাড়ায় যাত্রী পারাপার করতে বাধ্য হয়েছেন বোট মালিকরা।
এর আগে ভাড়া কমানোর প্রতিবাদে টানা দু’দিন স্পিডবোট চলাচল বন্ধ রেখে সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে রাখে মালিক পক্ষ।
পুরো ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১২ মে। ওই দিন সরকার দেশের ৪৪টি নৌরুটে স্পিডবোটের নতুন ভাড়া নির্ধারণ করে প্রজ্ঞাপন জারি করে। সেখানে চট্টগ্রাম-সন্দ্বীপ রুটে যাত্রীপ্রতি ভাড়া ২৬০ টাকা ঠিক করা হয়। অথচ এতদিন মালিকরা যাত্রীদের কাছ থেকে ৩০০ টাকা করে আদায় করে আসছিলেন। নতুন ভাড়ার তালিকা প্রকাশের পর থেকেই মালিকপক্ষ দাবি করে, এই টাকায় তাদের ব্যবসা চালানো সম্ভব নয়। এরপরই তারা হঠাৎ বোট চলাচল বন্ধ করে দেন।
সন্দ্বীপের যাতায়াতের প্রধান রুট হলো কুমিরা-গুপ্তছড়া। এখানে তিনটি প্রতিষ্ঠানের প্রায় ৩০টি স্পিডবোট চলে। প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার যাত্রী এই পথে যাতায়াত করেন, যার বড় অংশই সময় বাঁচাতে স্পিডবোট বেছে নেন। মালিকদের ধর্মঘটে ঘাটে আটকা পড়েন শত শত মানুষ। রোগী, শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীরা চরম বিপাকে পড়েন। অনেকে জরুরি প্রয়োজনে শহরে যেতে না পেরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করতে থাকেন।
স্থানীয়দের মতে, সন্দ্বীপের বাসিন্দারা দীর্ঘদিন ধরে নৌ-সিন্ডিকেটের কাছে জিম্মি হয়ে আছেন। প্রবাসী সাদিক খান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিযোগ করে জানান, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী এই রুট নিয়ন্ত্রণ করে। তাদের আধিপত্যের কারণে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে উঠতে পারে না। ফলে সাধারণ মানুষ অনেকটা বাধ্য হয়েই তাদের খেয়ালখুশিমতো ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করেন।
এই অচলাবস্থা নিরসনে সন্দ্বীপ উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি সুজা উদ্দৌলা সজীব জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ কল করে বিষয়টি অবহিত করেন এবং সবাইকে প্রতিবাদের আহ্বান জানান। যুবদল নেতা নিঝুম খান বড় ধরনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষের প্রতিবাদের ভাষা এতটাই তীব্র ছিল যে, প্রশাসন দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
বুধবার দুপুরে সন্দ্বীপ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমজাদ হোসেনের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল গুপ্তছড়া ঘাটে যান। সেখানে মালিকপক্ষকে কড়া বার্তা দিয়ে সরকার নির্ধারিত ভাড়ায় বোট চালাতে বাধ্য করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জানান, ব্যবসায়িক ক্ষতির অজুহাত দিয়ে মালিকরা বোট বন্ধ রেখেছিলেন, তবে জনস্বার্থে তাদের নির্ধারিত ভাড়ায় ফিরে আসতে হয়েছে।
স্থানীয় সাংবাদিক ওমর ফয়সাল মনে করেন, কেবল ভাড়া কমানোই সমাধান নয়। এই রুটে যাত্রী হয়রানি ও অনিয়ম দীর্ঘদিনের। ফোরকান উদ্দীন রিজভী নামে এক যাত্রী ভিডিও বার্তায় বলেন, সিন্ডিকেট ভাঙতে না পারলে এই পরিস্থিতির স্থায়ী পরিবর্তন আসবে না।
স্থায়ী সমাধানের দাবি তুলে ‘আমরা সন্দ্বীপবাসী’ সংগঠনের সমন্বয়ক মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন বলেন, এই রুটে স্বচ্ছতা ফেরাতে ডিজিটাল টিকেটিং ও কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। একই সুরে গণ অধিকার পরিষদের কেন্দ্রীয় নেত্রী নাসরিন আকতার লাকি বলেন, সন্দ্বীপবাসীর জন্য এই নৌপথ বিলাসিতা নয়, বরং বেঁচে থাকার একমাত্র পথ। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে এই পথ জিম্মি থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়।


