একের পর এক অঘটনে দিন দিন উত্তপ্ত হয়ে উঠছে রাজধানীর অপরাধ জগৎ। বিশেষ করে পেশাদার শ্যুটাররা এখন নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি। এদের কাছে রয়েছে আধুনিক সব আগ্নেয়াস্ত্র। আসন্ন সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শ্যুটাররা ‘টার্গেট কিলিং’ বা নির্দিষ্ট কাউকে হত্যার মিশনে নেমে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পুলিশ ও গোয়েন্দারা।
একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য ও পুলিশের রেকর্ড যাচাই করে ঢাকার ৪৯টি থানার ১০৪ জন শ্যুটারের একটি তালিকা করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) ক্রাইম ডিভিশন থেকে এই তালিকা আটটি বিভাগে পাঠিয়ে খুনিদের গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে ধরা সম্ভব হয়নি। মাঝে মাঝে কিছু অস্ত্র উদ্ধার হলেও আন্ডারওয়ার্ল্ডে থাকা বিশাল অস্ত্রের তুলনায় তা খুবই নগণ্য।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অভিযান) এস এন নজরুল ইসলাম ‘টাইমস অব বাংলাদেশ’কে জানান, যারা আগে অস্ত্র ব্যবহার করে খুনাখুনিতে জড়িয়েছে, তাদের নাম তালিকায় আনা হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে এই তালিকা তৈরি করে তাদেরকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী তৌহিদুল হক মনে করেন, এই টার্গেট কিলিং থামানো আইনশৃঙ্ক্ষলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। মূলত নির্বাচন ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের জন্যই এই ধরনের হত্যাকাণ্ড ঘটে থাকে।
তার মতে, শুধু তালিকা করলেই হবে না, শ্যুটারদের ধরতে বিশেষ অভিযান দরকার। কারণ, চলমান ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযান অপরাধীদের মনে তেমন কোনো ভয় ধরাতে পারেনি, তারা এখনো সক্রিয়।
ডিএমপির ক্রাইম ডিভিশনের কর্মকর্তাদের মতে, পল্লবীতে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়া, আদালত পাড়ায় শীর্ষ সন্ত্রাসী তারিক সাঈদ মামুন এবং পল্টন কালভার্ট রোডে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ওসমান হাদি হত্যার শিকার হওয়ার পর নির্বাচনে প্রার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে দুশ্চিন্তা বেড়ে যায়। এরপরই গোয়েন্দা প্রতিবেদন ও দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের অপরাধের খতিয়ান দেখে শ্যুটারদের এই তালিকা করা হয়। কিন্তু তালিকায় থাকা সন্ত্রাসীদের তাদের বর্তমান ঠিকানায় পাওয়া যাচ্ছে না। তারা আদালতেও হাজিরা দেয় না, ঘনঘন মোবাইল নম্বর বদলে ফেলছে। তবে আন্ডারওয়ার্ল্ডে তাদের গোপন তৎপরতা ঠিকই চলছে। এই তালিকা তৈরির পরও পশ্চিম তেঁজতুরি পাড়ায় টার্গেট কিলিংয়ের শিকার হয়েছেন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মোসাব্বির।
ক্ষুদ্রাস্ত্রের চাহিদা
অপরাধ জগতের ভেতরে কথা বলে জানা গেছে, খুনাখুনির কাজে এখন ছোট অস্ত্রের ব্যবহারই বেশি। পিস্তল ও রিভলবার চালানোয় দক্ষ এমন অনেক শ্যুটার এখন সক্রিয়। আগের মতো পাইপগান, কাটা রাইফেল, উজি রাইফেল, একে-৪৭ কিংবা এম-১৬ এর ব্যবহার এখন আর তেমন দেখা যায় না। এখন অপরাধীদের পছন্দের তালিকায় আছে সি-জেড, প্যাট্রাব্যারেটা, নাইন এমএম, এইট শ্যুটার, নাইন শ্যুটার ও তাওরাশ। বিশেষ করে ইতালি ও স্পেনে তৈরি অস্ত্রের ওপর শ্যুটারদের ভরসা বেশি। কারণ, ব্যবহারের সময় এগুলো ‘বিট্রে’ করে না বা আটকে যায় না। এসব অস্ত্র যেমন কেনা যায়, তেমনি ভাড়ায়ও পাওয়া যায়।
ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন জানান, শ্যুটারদের কার বিরুদ্ধে কী মামলা আছে এবং সেই মামলার বর্তমান অবস্থা কী, তা-ও তালিকায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তাদের কেউই এখনো গ্রেপ্তার হয়নি।
৪০১ ভাসমান অপরাধী
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, ঢাকার সার্বিক নিরাপত্তার জন্য ৪০১ জন সন্ত্রাসী অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এরা নিয়মিত অবস্থান ও মোবাইল নম্বর বদলায়, এমনকি অনেকে বিদেশি নম্বরও ব্যবহার করে। খুন, চাঁদাবাজি ও ছিনতাইসহ নানা অপরাধে জড়িত এসব সন্ত্রাসীর অনেক গ্রুপ ও উপ-গ্রুপ রয়েছে। এদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পাড়া-মহল্লায় কিশোর গ্যাংয়ের দাপটও বেড়েছে। সামনে নির্বাচন থাকায় এসব অপরাধীর পোয়াবারো অবস্থা। তারা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে ঘুরছে এবং মোটরসাইকেল মহড়া দিচ্ছে। অথচ এদের ধরতে পুলিশের তৎপরতা অনেকটাই গতানুগতিক। রাজধানী বা দেশের কোথাও যৌথ বাহিনীর টহল থাকলেও বিশেষ কোনো সাঁড়াশি অভিযান দেখা যাচ্ছে না।
তালিকায় দেখা যায়, ডিএমপির আটটি বিভাগের মধ্যে মতিঝিলে অপরাধী সবচেয়ে বেশি। সেখানকার ১১৮ জন সন্ত্রাসীর মধ্যে অনেক ভাড়াটে খুনিও আছে। এরপর রয়েছে ওয়ারী বিভাগ (৭৩ জন), তেজগাঁও (৬১ জন) ও মিরপুর (৬০ জন)। এ ছাড়া রমনা বিভাগে ৩৬ জন, লালবাগ বিভাগে ২৪ জন, গুলশান বিভাগে ১৬ জন এবং উত্তরা বিভাগে ১৩ জন দুর্ধর্ষ অপরাধী সক্রিয়। নির্দিষ্ট এলাকা হিসেবে মতিঝিলে ১০৬ জন, পল্লবীতে ৪২ জন, মোহাম্মদপুরে ৩৯ জন, কদমতলীতে ৩৪ জন, শ্যামপুরে ২১ জন এবং নিউমার্কেটে ২০ জন অপরাধী পুলিশের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ।
মতিঝিল জোনের ডিসি মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ জানান, শ্যুটারদের তালিকা ধরে নিয়মিত অভিযান ও তালিকা হালনাগাদের কাজ চলছে। গোয়েন্দারা বলছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে অপরাধীদের তালিকাও বদলে যায়। অনেকে গা-ঢাকা দেয় বা বিদেশে পালিয়ে যায়, আবার নতুন অপরাধীর জন্ম হয়। বর্তমানে তালিকায় থাকা ৪০১ জনের অনেকে বিদেশে থেকে অপরাধ জগৎ নিয়ন্ত্রণ করছে।
ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম টাইমসকে বলেন, তালিকা ধরে ক্রাইম ডিভিশন ও ডিবি কাজ করছে। পাশাপাশি যৌথ বাহিনীর অন্যান্য সংস্থাও তাদের নির্ধারিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে।


