ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরুর ছয় মাসের বেশি সময় পেরিয়েছে। এর মধ্যে দেশটির অধিকাংশ মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও কমেছে। ৯ কোটি মানুষের বেশির ভাগের জীবন এখন প্রতিদিনের সংগ্রামে পরিণত হয়েছে।
যুদ্ধের নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে ইরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্ব মানিয়ে নিয়েছে। তবে নিজেদের আদর্শিক অবস্থান থেকে বড় কোনো ছাড় দেয়নি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়। হামলায় তৎকালীন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পসকে (আইআরজিসি) ও রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ ব্যক্তিরা নিহত হন।
এর পরও ইরান সরকার টিকে থাকে। প্রয়াত নেতার ছেলে মোজতবা খামেনিকে সর্বোচ্চ নেতা করা হয়। তবে তিনি জনসমক্ষে খুব একটা আসছেন না। কয়েকজন সামরিক কমান্ডারকেও বদলে দেওয়া হয়েছে।
সরকারের ভেতরে যুদ্ধের কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে একটি অংশ রয়েছে। আরেক অংশ যুক্তরাষ্ট্র পিছু না হটা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়। তবে উভয় পক্ষই একমত, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কাছে কোনো ‘আত্মসমর্পণ’ করা হবে না।
হরমুজ প্রণালিতে একটি নৌ চলাচল পথ চালুর বিষয়ে ওমানের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে বলে জানিয়েছে ইরান। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার কারণে যুদ্ধের আগের তুলনায় সেখানে নৌ চলাচল এখন খুবই কম।
তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন এই সমঝোতার বিরোধিতা করছে বলে খবর পাওয়া গেছে। তারা প্রণালিটি পুরোপুরি ও অবাধে খুলে দেওয়ার পক্ষে। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে বড় মতপার্থক্য রয়ে গেছে।
আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীরা যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের আলোচনা পুনরায় শুরুর চেষ্টা করছেন। তবে ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর এযাবৎকালের সবচেয়ে কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করায় কোনো অগ্রগতি হয়নি।
ইরান সরকারের কিছু সমর্থক প্রতিরাতে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরের রাস্তায় ছোট ছোট দলে জড়ো হচ্ছেন। সশস্ত্র বাহিনীর সমর্থন পাওয়া এসব সমর্থকের অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধ আবার শুরুর পক্ষে।
তবে ইরানের অনেক মানুষ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার বিপক্ষে। প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের অর্থসংকটে থাকা সরকারের একটি অংশও এ বিষয়ে সতর্ক। যুদ্ধে ইরানে ৩ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। বেসামরিক অবকাঠামোর বড় অংশ ধ্বংস হয়েছে। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ মানুষ দীর্ঘ অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছেন।
তেহরানের তরুণী মারজান নিরাপত্তার কারণে শুধু প্রথম নাম ব্যবহার করে আল জাজিরাকে বলেন, ‘আমি এমন একটি জীবন চাই, যেখানে সব সময় অন্যদের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে হবে না, বিশ্বের বাকি অংশ থেকে আরও বিচ্ছিন্ন হতে হবে না, বেঁচে থাকার পরিকল্পনা করতে হবে না।’
তিনি বলেন, ‘আমি সেই জীবনের কথা ভাবি। হতাশ হই, কারণ সেই জীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ আমাদের দেওয়া হচ্ছে না। তারপর আরেকটি দিন পার করি। এটি ভীষণ ক্লান্তিকর সময়।’
দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা ও বাইরের চাপ যুক্ত হয়ে ইরানের অর্থনীতি এখন বড় সংকটে।
গত দুই বছরের বেশির ভাগ সময় দেশটি ‘যুদ্ধ নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতিতে ছিল। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে দুটি যুদ্ধ ও অবরোধের মুখে পড়েছে ইরান। ফলে অর্থনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী মানুষের সংখ্যা কম।
২২ আগস্ট শেষ হওয়া ইরানি মাস মোরদাদে দেশটির পরিসংখ্যান কেন্দ্র জানায়, আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় মূল্যস্ফীতি ৮৯ শতাংশ বেড়েছে। খাদ্যপণ্যের মূল্যস্ফীতি বেড়েছে ১২৭ শতাংশের বেশি।
তেহরানের একটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানে ডেটা অ্যানালিস্ট হিসেবে কাজ করেন বিজান। তিনি জানান, প্রায় তিন বছর আগে চাকরিতে যোগ দেওয়ার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ১ হাজার ডলারের বেশি। মূল্যস্ফীতির কারণে এখন সেই বেতনের মূল্য ৫০০ ডলারের নিচে নেমেছে।
বিজান আল জাজিরাকে বলেন, ‘তিনবার বেতন বাড়ার পরও এখন আমার বেতনের মূল্য ৫০০ ডলারের কম।’
৩৩ বছর বয়সী বিজান বলেন, এক দশকেরও বেশি আগে স্নাতক শেষ করার পর ইরান ছেড়ে গেলে তার জীবন কেমন হতো, তা মাঝে মাঝে ভাবেন।
তিনি বলেন, ‘তখন কেউ ভাবেনি পরিস্থিতি এত খারাপ হবে।’
শনিবার তেহরানের খোলা বাজারে মার্কিন ডলারের বিপরীতে ইরানি মুদ্রা রিয়ালের দর সর্বকালের সর্বনিম্নে নেমেছে। এক ডলারের দাম দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৬ হাজার রিয়াল।
যুদ্ধের সময় ইরানের তেল-গ্যাস স্থাপনা, পেট্রোকেমিক্যাল, ইস্পাত ও বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘরবাড়ি, বন্দর, বিমানবন্দর, সেতুসহ বিভিন্ন অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিশ্বের অন্যতম সম্পদসমৃদ্ধ দেশ ইরান এখন জ্বালানি ও বিদ্যুতের সংকটে পড়েছে। শীত মৌসুম সামনে রেখে প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ব্যক্তিগত গাড়ির জ্বালানি কোটা কমানো হয়েছে। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে পেট্রোলের দাম বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ইরান সরকার যুদ্ধ নিয়ে বিশ্বকে ‘পবিত্র ঐক্য’র বার্তা দেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে। অধিকাংশ মানুষ প্রকাশ্যে মতামত দিতে সতর্ক থাকলেও রাজনীতিবিদদের বক্তব্যে বড় মতপার্থক্য দেখা যাচ্ছে।
শুক্রবার মোজতবা খামেনির নামে প্রকাশিত সর্বশেষ লিখিত বার্তায় বলা হয়, ‘সামাজিক সংহতির জন্য ক্ষতিকর যেকোনো কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ।’
এর কয়েক ঘণ্টা পর প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে বলেন, সরকার তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে। তেল বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছে। অবরুদ্ধ জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতিও করতে পারছে না।
এদিকে বিচার বিভাগ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সরকারি বয়ানের বাইরে কোনো কর্মকাণ্ড বা মন্তব্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে।
বিচার বিভাগ প্রতি সপ্তাহে নতুন মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের ঘোষণা দিচ্ছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালের জুনের ১২ দিনের যুদ্ধ ও জানুয়ারির দেশব্যাপী সরকারবিরোধী বিক্ষোভে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরাও রয়েছেন।
গত মাসে জাতীয় নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে ইরানিদের সঙ্গে যোগাযোগ না করার জন্য কিছু ব্যক্তি ও গণমাধ্যমের তালিকা প্রকাশ করেছে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এসব মৃত্যুদণ্ডের নিন্দা জানিয়েছে। ২০২২ ও ২০২৩ সালে বাধ্যতামূলক পোশাকবিধির বিরুদ্ধে ব্যাপক বিক্ষোভের কয়েক বছর পর সরকার বাধ্যতামূলক হিজাব আইন আরও কঠোরভাবে কার্যকরের উদ্যোগ নিয়েছে।
চলতি সপ্তাহে ইসলামি রীতিনীতি ও সরকারি আইন না মানার অভিযোগে কয়েকটি ক্যাফে, আইসক্রিমের দোকান ও ব্যক্তিমালিকানাধীন অনলাইন বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
তেহরানের আরেক তরুণ বাসিন্দা সাসান বলেন, বাইরের চাপ বাড়লে কর্তৃপক্ষ তাদের নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করে।
তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো হতাশার কষ্ট অনুভব করি। সব সময় চেষ্টা করেও দেখি সবকিছু আমার বিরুদ্ধে যাচ্ছে। ভবিষ্যৎও যেন আমার নিয়ন্ত্রণের বাইরে।’


