মধ্যরাতে হঠাৎই ফুলে-ফেঁপে ওঠা তিস্তা নদীর পানিতে প্লাবিত হয়েছে লালমনিরহাট, নীলফামারি, রংপুর, কুড়িগ্রামের চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা। কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে ঘরবাড়িতে। রাস্তাঘাট বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে, ডুবে গেছে আমন ধান ও শাকসবজির মাঠ। পরিবারের শিশু-বয়স্ক সদস্য ও গবাদিপশু নিয়ে আতঙ্কিত মানুষজন ছুটছেন উঁচু জায়গায়, কেউ কেউ আশ্রয় নিয়েছেন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে।
তিস্তা অববাহিকায় এরই মধ্যে জারি করা হয়েছে রেড অ্যালার্ট (সর্বোচ্চ সতর্কতা)। মাইকিং করে নদীর দুইপাড়ের বাসিন্দাদের নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে বলা হচ্ছে।
ভারতের গাজলডোবা বাঁধের সব কপাট খুলে দেওয়ায় এবং উজানে ভারী বৃষ্টির কারণে হঠাৎ বেড়ে গেছে তিস্তার পানি। রোববার রাত ১২টার দিকে নীলফামারির ডালিয়া ব্যারেজে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হতে দেখা যায়। বাড়তে থাকা পানি সামলাতে ডালিয়া ব্যারেজের ৪৪টি জলকপাট খুলে দেওয়া হলেও পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি।
ডালিয়া ব্যারেজের পূর্বপাশে অবস্থিত ফ্লাড বাইপাসের ওপর দিয়েও প্রবাহিত হচ্ছে পানি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) জানিয়েছে, পরিস্থিতির অবনতি হলে যেকোনো সময় পানি নিস্কাশনের জন্য বাইপাসটি কেটে দেওয়া হতে পারে।
পাউবো ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী বলেন, রোববার রাত ১২টায় ডালিয়া ব্যারেজ পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপৎসীমার ৩৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। যা রাত ১০টায় ৩০ সেন্টিমিটার, ৮টায় ২৯ সেন্টিমিটার এবং সন্ধ্যা ৬টায় ১০ সেন্টিমিটার উপরে ছিল।

তিস্তার ডালিয়া পয়েন্টে রোববার সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত পানি বৃদ্ধি পায় ৬৯ সেন্টিমিটার। বিকাল ৩টার পর থেকে তা বিপৎসীমা অতিক্রম করে। এই সময়ে উজানে ভারতের দোমোহনীতে ১৫৮ এবং গাজলডোবায় ২২০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ভুটানের ওয়াংচু নদীর পানি তালা ড্যামের উপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ধরলা ও দুধকুমার নদীর উজানে ভারতে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে বইছে। ফলে সোমবার সকাল থেকেই ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানিও বাংলাদেশে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
পাউবোর উত্তরাঞ্চলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আহসান হাবিব বলেন, ভারতের দোমোহনী ও গাজলডোবা পয়েন্টে পানি হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি ভুটানের ওয়াংচু নদীর পানি তালা ড্যামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় ধরলা ও দুধকুমার নদীতেও পানি বাড়ছে।
তিস্তার পানি বাড়ায় নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার অন্তত ২২৫টি গ্রামের প্রায় দুই লাখ মানুষ বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। চরাঞ্চল ও নদীতীরবর্তী নিম্নাঞ্চলের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। হাজার হাজার হেক্টর জমির ফসল পানির নিচে ডুবে গেছে। তলিয়ে গেছে পুকুরের মাছ, নষ্ট হচ্ছে ঘরের আসবাবপত্র।

জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, এসব এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। শুরু হয়েছে শুকনো খাবার বিতরণ। পানিবন্দি মানুষদের জন্য বিশুদ্ধ পানি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থাও নেওয়া হচ্ছে।
রংপুর আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় সিকিম, দার্জিলিং, কুচবিহার ও বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে ভারী বৃষ্টি হতে পারে। এতে করে তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি আরও বাড়তে পারে।
তিস্তা নদী রক্ষা আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবিব বলেন, ‘এই তাণ্ডব প্রতিবছর হচ্ছে। স্থায়ী সমাধান না হলে দুই কোটিরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকিতে থাকবে।’ সেজন্য নভেম্বরের মধ্যেই তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে বলেই মনে করেন তিনি।
রংপুরের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রবিউল ফয়সাল, লালমনিরহাটের ডিসি এইচ এম রকিব হায়দারসহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসন মাঠপর্যায়ে কাজ শুরু করেছে। জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, রাত থেকেই ত্রাণ কার্যক্রম ও এলাকাবাসীকে নিরাপদ আশ্রয়ে স্থানান্তরের কাজ করা চলছে।


