বিমানে টিকিটের অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট ও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়েছে সরকার। প্রবাসী কর্মীদের জন্য বিমানভাড়া সহনীয় রাখতে ট্রাভেল এজেন্সি আইন ও বেসামরিক বিমান চলাচল আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে টিকিটের কালোবাজারি ঠেকাতে বিমানের টিকিটে সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির নাম, লাইসেন্স নম্বর ও প্রকৃত বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
রোববার বিকালে জাতীয় সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এসব তথ্য জানান।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে অধিবেশনে তিনি আরও জানান, যাত্রীদের স্বার্থ রক্ষা ও টিকিট বিক্রিতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে সরকার ইতোমধ্যে ১০ দফা সম্বলিত একটি পরিপত্র জারি করেছে। এর আওতায় সকল ট্রাভেল এজেন্সিকে টিকিটে তাদের নাম, লাইসেন্স নম্বর ও বিক্রয়মূল্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে।
বিমানভাড়া প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিশ্বব্যাপী এভিয়েশন খাতে সাধারণত ‘ডাইনামিক প্রাইসিং’ পদ্ধতিতে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। রুট, দূরত্ব, বুকিংয়ের সময়, যাত্রার তারিখ, আসন প্রাপ্যতা, জ্বালানির দাম, বিমানবন্দর চার্জ, সরকারি কর ও অন্যান্য ফি বিবেচনায় নিয়ে টিকিটের মূল্য নির্ধারিত হয়। ফলে চাহিদা ও আসন প্রাপ্যতার ভিন্নতার কারণে একই রুটে বিভিন্ন সময়ে ভাড়ায় পার্থক্য হতে পারে।
তিনি জানান, কোনো কোনো সময় কৃত্রিম সংকট তৈরি করে একটি অসাধু চক্র শেষ মুহূর্তে টিকিট কালোবাজারির চেষ্টা করে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড বন্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
প্রবাসী কর্মীদের জন্যও বিশেষ সুবিধা দেওয়ার উদ্যোগের কথা সংসদে জানান বিমানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের টিকিটে বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া প্রবাসী কার্ডধারীদের জন্য বলাকা লাউঞ্জে বিশেষ সুবিধা, পৃথক ইমিগ্রেশন চ্যানেল এবং অগ্রাধিকারভিত্তিক চেক-ইনের ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
থার্ড টার্মিনালে বাড়তি ৯০২ কোটি টাকা
হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল চালু করতে অতিরিক্ত ৯০২ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তারও ব্যাখ্যা দিয়েছেন বিমানমন্ত্রী। এর আগে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য হান্নান মাসউদ অভিযোগ করেন, টার্মিনালের প্রাক্কলিত ব্যয় কয়েক দফা বেড়ে ২১ হাজার ৩০০ কোটি টাকায় পৌঁছেছে।
প্রায় ৯৯ দশমিক ৯১ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ার পর আবার ৯০২ কোটি টাকা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না এবং এতে ঠিকাদারকে দুর্নীতির সুযোগ দেওয়া হচ্ছে কি না, তা জানতে চান তিনি।
জবাবে বিমান মন্ত্রী বলেন, আগের সরকারের সময়ে শুধু ভবন উদ্বোধন করেই কাজ শেষ দেখানোর প্রবণতা ছিল। কিন্তু থার্ড টার্মিনালের গুরুত্বপূর্ণ মেশিনারিজ, সংকেত ও বিভিন্ন সংযোজনের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। এতে প্রায় ২ দশমিক এক বিলিয়ন ডলার মূল্যের রাষ্ট্রীয় সম্পদ অচল হয়ে পড়ে থাকার ঝুঁকি তৈরি হয়।
তিনি বলেন, জাইকার ঋণের কিস্তি পরিশোধ শুরু হলেও টার্মিনাল সচল না থাকায় কোনো আয় হচ্ছিল না। সার্বিক হিসাব পর্যালোচনার পর টার্মিনাল পুরোপুরি চালু করতে ঠিকাদারের কিছু বকেয়া ও অন্যান্য সংস্থার পাওনা পরিশোধসহ মোট ৯০২ কোটি টাকার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বরাদ্দ অনুমোদন হলে দ্রুত টার্মিনাল চালু করা সম্ভব হবে। এতে বর্তমানে ১২ লাখ যাত্রীর পরিবর্তে প্রায় দ্বিগুণ যাত্রীকে সেবা দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে এবং সেই আয় থেকে জাইকার ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব হবে।
পর্যটন খাতে মহাপরিকল্পনা
দেশের পর্যটন খাতের উন্নয়নে প্রায় এক হাজার ৪৯৮টি সম্ভাবনাময় পর্যটন স্থান চিহ্নিত করে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
সরকারি দলের সদস্য শওকত আরা আক্তারের প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ‘জাতীয় পর্যটন নীতিমালা ২০২৬’ প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। পর্যটন খাতের সঠিক তথ্য ও পরিসংখ্যান নিশ্চিত করতে ‘ট্যুরিজম স্যাটেলাইট অ্যাকাউন্ট’ প্রণয়নের কার্যক্রম চলছে।
স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে ‘কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম’ মডেলে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন ও পর্যটকদের নিরাপত্তায় ট্যুরিস্ট পুলিশের জনবল ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
পর্যটন মন্ত্রী জানান, সাংস্কৃতিক পর্যটনের প্রসারে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে দুই মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমঝোতা স্মারক, এসওপি এবং যৌথ টাস্কফোর্স গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে ‘বিউটিফুল বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদারের পরিকল্পনাও রয়েছে।


