বর্তমান সরকারের গত ছয় মাসের মেয়াদে দেশে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি বলে দাবি করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে মানবাধিকার সংগঠন ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ দাবি করেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের মেয়াদে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। নড়বড়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। বাহিনীর সদস্যদের পেশাদারত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি তাদের মনোবল বৃদ্ধি ও ইতিবাচক উৎসাহ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে ‘পুরস্কার ও শাস্তি’নীতির ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। দায়িত্ব পালনে ভালো কাজের জন্য পুরস্কারের পাশাপাশি অনিয়ম ও অপরাধের ক্ষেত্রে জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতানির্ভর নতুন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের আইন মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়েছে। নতুন এই এলিট ফোর্সকে আরও পেশাদার ও জবাবদিহিমূলক কাঠামোর মধ্যে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানে প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’-এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আইনটি গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতের মাধ্যমে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার পাওয়ার পথ সুগম করেছে।
তিনি জানান, গত ২৭ আগস্ট আইনটি সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে। এতে গুমের শ্রেণিবিভাগ ও অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন থেকে ক্ষেত্রমতে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকলে পাঁচ বছর পর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তার ওয়ারিশদের সম্পত্তির অধিকার লাভের সুযোগ রাখা হয়েছে। দায়ী পক্ষ ক্ষতিপূরণ দিতে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকেও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান প্রস্তাব করা হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আইনটি বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে। সেখানে ভালো ও যৌক্তিক যেকোনো পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে।
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত গুমের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথ বাহিনীর ‘অপারেশন ম্যানগ্রোভ’ ও ‘অপারেশন সুন্দরবন’-এর কারণে জলদস্যু ও বনদস্যুরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, দস্যুদের নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের বিষয়েও তথ্য রয়েছে। নিরপেক্ষ তদন্তে কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন তিনি।
তবে বিষয়টি নিয়ে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকার প্রয়োজনে যেকোনো নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে প্রস্তুত রয়েছে বলেও জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে নিজের গুম হওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি জানান, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ৫ বাই ১০ ফুটের একটি প্রকোষ্ঠে কোনো ধরনের ভেন্টিলেশন ছাড়াই তাকে দীর্ঘদিন বন্দি রাখা হয়েছিল। সেখানে তিনি মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন।
তিনি বলেন, বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা থাকা সত্ত্বেও তাকে ন্যূনতম চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত করা হয়। পরে চোখ বেঁধে তাকে ভারতের শিলংয়ে পাচার করে দেওয়া হয়। বৈধ কাগজপত্র না থাকায় আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘনের মামলায় সেখানে দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর আইনি লড়াই করতে হয়। পরে ভারতীয় আদালত তাকে সব অভিযোগ থেকে খালাস দেয়।
এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ মুক্ত হওয়ায় বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ ও বীর ছাত্রদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলির সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনায় আরও বক্তব্য দেন সংসদ সদস্য হুমাম কাদের চৌধুরী, সংসদ সদস্য মীর আহমদ বিন কাসেম (ব্যারিস্টার আরমান), সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার সারা হোসেন, মানবাধিকার কর্মী নূর খান লিটন, আলোকচিত্র শিল্পী শহীদুল আলম এবং নেত্র নিউজের এক্সিকিউটিভ এডিটর নাজমুল আহসানসহ অনেকে।


