বন্যার পর নেপালে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়

বন্যার পর নেপালে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়
নেপালের নুয়াকোট জেলার দেবীঘাট এলাকায় ত্রিশূলী নদীর সাম্প্রতিক আকস্মিক বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ও স্থাপনাগুলো পরিদর্শন করছেন উদ্ধারকর্মীরা। ড্রোন থেকে তোলা ছবি। শনিবার, ২৯ আগস্ট ২০২৬। ছবি: এপি/ ইউএনবি
Advertisement
Advertisement

স্ত্রীর মরদেহ খুঁজতে ধ্বংসস্তূপে খালি হাতে কাদা সরাচ্ছেন ৭০ বছর বয়সী দিল বাহাদুর শ্রেষ্ঠা। তার স্ত্রী জামুনা শ্রেষ্ঠা গত বুধবার নেপালের ত্রিশূলী নদীর তীরে বেত্রাবতীতে নিখোঁজ হন।

বন্যার সময় জামুনাকে শেষবার বাড়িতে ঢুকতে দেখা যায়। তিনি মুরগিগুলোকে নিরাপদে সরানোর চেষ্টা করছিলেন। এরপর বাড়িটি পানির স্রোতে ধ্বংস হয়ে যায়।

দিল বাহাদুর তখন নদীর অপর পারে ধানখেতে কাজ করছিলেন। হঠাৎ মাটি কাঁপতে দেখেন। এরপর উপত্যকা দিয়ে কালো পানির ঢেউ এগিয়ে আসতে দেখেন। তিনি বনে পালিয়ে প্রাণে বাঁচেন। তার চোখের সামনে দুটি সেতু ভেসে যায়।

তিনি বলেন, ‘স্রোত আঘাত হানার দুই মিনিটের মধ্যেই সবকিছু ধ্বংস হয়ে যায়।’

নেপালে ৫ হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। চীনের তিব্বত অঞ্চলে নিখোঁজ আরও ৫৪৬ জন। নেপাল ও তিব্বতে বন্যায় ১ হাজার ২০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

উদ্ধারকর্মীরা এখনও দিল বাহাদুরের বাড়িতে পৌঁছাতে পারেননি। তাই তিনি নিজেই স্ত্রীর মরদেহ খুঁজছেন।

তিনি বলেন, ‘এখনও আমি বিশ্বাস করতে পারছি না যে সে নেই। আমি তাকে ভুলতে পারি না। তাই তাকে খুঁজতে ঘুরে বেড়াই।’

বেত্রাবতীতে গত বুধবার সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে হিমালয়ের নেপাল-তিব্বত সীমান্তে একটি হিমবাহ উপত্যকায় ধসে পড়ে। এতে ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদীতে আকস্মিক বন্যা শুরু হয়। ১৩ মিনিট পর বেত্রাবতী পানিতে তলিয়ে যায়।

একসময় প্রাণবন্ত বাজার শহরটি এখন কাদায় ঢাকা। ছয়তলা ভবনের ওপরের দুটি তলা ছাড়া প্রায় সবকিছুই ধ্বংস হয়েছে। বাড়িঘর, স্কুলবাস ও দোকান ভেসে গেছে। বন্যায় নদীর গতিপথও বদলে গেছে।

ধ্বংসস্তূপে ছড়িয়ে আছে মানুষের জীবনের নানা স্মৃতি। কেটলি, টেডি বিয়ার, হিসাবের খাতা, সসপ্যান, ওষুধের প্যাকেট ও চশমা পড়ে আছে। অন্তত ২৫০ জন নিখোঁজ। তাঁদের মধ্যে দিল বাহাদুরের ভাই ও ভাবিও রয়েছেন।

আরও পড়ুন

উদ্ধারকারীরা এক বাড়ি থেকে ২৪টি মরদেহ উদ্ধার করেছেন। দিল বাহাদুর বলেন, ‘আমার মনে হয়, এখানে এখনও শত শত মরদেহ থাকতে পারে। এত মানুষ একসঙ্গে স্রোতে ভেসে গেছে।’

আরেক বাসিন্দা ৫৭ বছর বয়সী সান্তামায়া লাওয়াত পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হারিয়েছেন। মাত্র ১০ মাস আগে জীবনের সঞ্চয় দিয়ে তৈরি করা তার নিজের বাড়িটিও কাদায় ভরে গেছে।

তিনি বলেন, ‘এই বাড়িতেই জীবনের বাকি সময় কাটানোর কথা ছিল। এখন সব শেষ। জায়গাটি স্বর্গের মতো ছিল। এখন নরকে পরিণত হয়েছে।’

তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় ধ্বংসযজ্ঞ আরও ভয়াবহ। অনেক গ্রাম পুরোপুরি ভেসে গেছে। কিছু এলাকায় এখনও হেলিকপ্টার ছাড়া পৌঁছানো যাচ্ছে না।
সীমান্তবর্তী তিমুরে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়েছে। সেখানে এখন পর্যন্ত ৯০টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

সিয়াব্রু বেসি গ্রামও পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে। গ্রামে যাওয়ার সড়কও নেই। স্থানীয় কর্মকর্তাদের হিসাবে, সেখানে অন্তত ৫০০ মানুষ নিখোঁজ। গ্রামের একটি ভবন ছাড়া আর কিছু দাঁড়িয়ে নেই।

৫০ বছর বয়সী কৃষক ছিরিং দর্জে পালিয়ে বাঁচলেও তার পরিবারের পাঁচ সদস্য নিখোঁজ। তিনি বলেন, ‘খাবার ছিল না। বনের পানি পান করে বেঁচেছিলাম।’
তার নয় বছর বয়সী নাতনি রিতু তামাংও বন্যায় সব হারিয়েছে। সে বলে, ‘আমাদের বাড়ি যেখানে ছিল, সেখানে এখন কিছুই নেই। আমি প্রথম শ্রেণিতে পড়তাম। এখন স্কুলও নেই। শিক্ষকও নেই।’

কাঠমান্ডু থেকে রাসুয়া যাওয়ার সড়ক ভেসে যাওয়ায় এখন কাদা-পাথরের দুর্গম পথ ব্যবহার করতে হচ্ছে। যেতে ১২ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এতে ত্রাণ ও উদ্ধার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ত্রাণবাহী ট্রাক ধুনচেতে আটকে আছে।

বেত্রাবতী ও ধুনচের মধ্যবর্তী একটি ত্রাণশিবিরে ওষুধ ও খাবার দেওয়া হচ্ছে। চিকিৎসকেরা বলেন, সেখানে কয়েক ডজন শিশু বন্যায় বাবা-মাকে হারিয়েছে।
স্থানীয় নীলকণ্ঠ স্কুলের ২০০-র বেশি শিশু নিখোঁজ। তাদের বয়স ৫ থেকে ১১ বছর। সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় তারা বন্যার স্রোতে ভেসে গেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শিক্ষক প্রকাশ নেপাল বলেন, বন্যার ১০ মিনিট আগে স্কুল কর্তৃপক্ষ সতর্কবার্তা পায়। তখন স্কুলবাস শিক্ষার্থীদের তুলছিল। বাসচালকের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করে বাস থামানো হয়। এতে বাসের শিক্ষার্থীরা বেঁচে যায়।

তবে নদীর তীরে অস্থায়ী বসতিতে থাকা অনেক পরিবারের শিশু তখন হেঁটে স্কুলে যাচ্ছিল। প্রকাশ নেপাল বলেন, ‘রাস্তায় থাকা শিক্ষার্থীদের আমরা বাঁচাতে পারিনি।’

এই বিপর্যয়ের মধ্যেও আশার গল্প আছে।

লাচিয়াং গ্রামের রামকৃষ্ণ নেউপানে ও তার স্ত্রী মুইয়া নেউপানে তাদের একমাত্র ছেলেকে নিয়ে দুই দিন কোনো খবর পাননি। তাদের ছেলে সিয়াব্রু বেসিতে পশুচিকিৎসক হিসেবে কাজ করতেন।

পরে কাঠমান্ডুর একটি হাসপাতাল থেকে ফোন আসে। সেনাবাহিনী তাকে উদ্ধার করেছিল।

রামকৃষ্ণ বলেন, ‘সে কথা বলতে পারছিল না, শুধু কাঁদছিল। আমরাও কাঁদছিলাম।’

তার স্ত্রী বলেন, ‘এটা ছিল অলৌকিক ঘটনা।’

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর