ভারতীয় নাগরিকদের ঠেলে ফেরৎ পাঠানো বা ‘পুশ ইন’ নিয়ে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে নতুন করে টানাপোড়েন দেখা দিয়েছে। দিল্লির আচরণের কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এরপরও সীমান্তের ওপারে বহু সংখ্যক ভারতীয়কে ‘পুশ ইনের’ চেষ্টায় জড়ো করে রেখেছে বিএসএফ।
৭ মে থেকে দু্ই সপ্তাহে খাগড়াছড়ি, কুড়িগ্রাম, সিলেট, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও লালমনিরহাট দিয়ে কমপক্ষে পাঁচশজনকে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করা হয়েছে।
ভারতের ‘পুশ ইন’ বন্ধে সীমান্তে বর্ডার গার্ড অব বাংলাদেশ—বিজিবির টহল বাড়ানোর পাশাপাশি বাহিনীটিতে জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা (রেড এলার্ট)।
বিজিবি জানিয়েছে, বৃহস্পতিবারই লালমনিরহাটের পাটগ্রাম সীমান্ত দিয়ে ভারতীয় সীমান্ত রক্ষী বাহিনী বিএসএফ সদস্যরা ১১ জনকে এপারে ‘পুশ ইন’ করে। আর দুদিনে ছয় জেলার বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে নারী, শিশুসহ অন্তত ১০৫ জনকে ঠেলে পাঠিয়েছে বিএসএফ। বুধবার রাত থেকে বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত কুমিল্লা, পঞ্চগড়, লালমনিরহাট, মৌলভীবাজার, খাগড়াছড়ি ও ফেনী জেলায় এসব ঘটনা ঘটে। পরে এই ব্যক্তিদের তাৎক্ষণিকভাবে আটক করে বিজিবি।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এক কাপড়ে সহায়-সম্বলহীন ‘পুশ ইনের’ শিকার নারী, পুরুষ ও শিশুরা ভবিষ্যত নিয়ে উদ্বিগ্ন। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে তারা সকলেই নিজেদের ভারতীয় নাগরিক বলে পরিচয় দিয়েছেন।

বিজিবির মুখপাত্র শরিফুল ইসলাম টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, যথাযথ প্রক্রিয়ায় “পুশ ইন” না করায় বিএসএফের সাথে বিভিন্ন পর্যায়ে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে মৌখিক ও লিখিতভাবে প্রতিবাদলিপি পাঠিয়ে জোরালো প্রতিবাদ জানিয়েছে বিজিবি।
তিনি বলেন, ‘এছাড়া “পুশ ইন” রোধে বিজিবি সীমান্তে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল তৎপরতা বৃদ্ধি করে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে থেকে সজাগ দৃষ্টি রাখছে।’
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বুধবার বলেন, ‘ভারতীয় নাগরিক হলে অবশ্যই “পুশ ইনের” শিকার লোকজনকে ফেরত নিতে হবে।’
‘দিল্লির সাথে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত আছে এবং আমরা চেষ্টা করছি যাতে নিয়মের বাইরে কোনো কিছু না ঘটে,’ বলেন তিনি।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা জানান, ‘পুশ ইনের’ ঘটনায় ভারতকে প্রতিবাদ চিঠি পাঠানো হয়েছে। দেশটি এখনো চিঠির জবাব দেয়নি।
সম্প্রতি ভারত সেদেশে স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য রপ্তানীতে বাংলাদেশের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। এর আগে দেশটি বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানীতে ট্রান্সশিপমেন্টের চুক্তিও স্থগিত করে।
পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন জানিয়েছেন, ‘স্থলবন্দর দিয়ে বাংলাদেশি পণ্য আমদানি বন্ধ করায় দিল্লিকে চিঠি পাঠাচ্ছে ঢাকা।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পট পরিবর্তনের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশিদের জন্য ভিসা সংকুচিত করে দিল্লি। পাশাপাশি চাল, পেয়াঁজসহ বেশি কিছু ভারতীয় পণ্যও এদেশে রপ্তানী বন্ধ করে তারা।
এমন আবহে নতুন করে ‘পুশ ইন’ শুরু করেছে দেশটি।
কাদের ‘পুশ ইন’ করা হচ্ছে?
বাংলাদেশে যা ‘পুশ ইন’ ভারতে তাই-ই ‘পুশ ব্যাক’।
সরেজমিন তথ্যের বরাত দিয়ে বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, শুধুমাত্র ভারতের গুজরাট এবং রাজস্থানেই গত তিন সপ্তাহে এক হাজারেরও বেশি মানুষকে চিহ্নিত করেছে ওই রাজ্য দু’টির পুলিশ। তাদের দাবি, এই চিহ্নিতরা বেআইনিভাবে ‘বাংলাদেশ থেকে এসে’ সেখানে বসবাস করছিলেন।
বিবিসি বাংলা নিশ্চিত করতে পেরেছে যে, সম্প্রতি সীমান্ত দিয়ে যাদের ঠেলে পাঠানো হয়েছে , তাদের মধ্যে এমন ব্যক্তিরাও ছিলেন, যাদের গুজরাট থেকে আনা হয়েছিল।
আবার রাজস্থানে যারা ধরা পড়েছেন, তাদের মধ্যে ১৪৮ জনের প্রথম দলটিকে বিশেষ বিমানে চাপিয়ে বুধবার নিয়ে যাওয়া হয়েছিল ত্রিপুরার আগরতলায়। ত্রিপুরার সঙ্গে বাংলাদেশের খাগড়াছড়ি, কুমিল্লা ও ব্রাক্ষণবাড়িয়া সীমান্ত রয়েছে।
বৃহস্পতিবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর সীমান্তে যে ‘পুশ ব্যাকের’ চেষ্টা হয়েছিল, তাদের মধ্যে কেউ রাজস্থানে ধরা পড়া কথিত বাংলাদেশি কি না, তা নিশ্চিত করা যায়নি।
গুজরাট ও রাজস্থান – দুই রাজ্যের পুলিশই বিবিসিকে জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশের যেসব নাগরিকের’ পরিচয় তারা নিশ্চিত করতে পেরেছেন, তাদের সকলকেই ফেরত পাঠানো হবে।
উড়িশ্যাসহ অন্য কয়েকটি রাজ্যেও ‘বাংলাদেশের এমন নাগরিকদের’ ধরা হচ্ছে যারা পুলিশের দাবি অনুযায়ী ‘অনুপ্রবেশকারী’।


