নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের সম্পত্তি বিক্রির আবেদন নামঞ্জুর করে আরও ৪৫ কোটি টাকার সম্পত্তি জব্দ করার আদেশ দিয়েছেন আদালত।
সোমবার দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালত এ আদেশ দেন।
নাসা গ্রুপের চালু কারখানাগুলোর নভেম্বরের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য গুলশান, আশুলিয়া ও সোনারগাঁওয়ের সম্পত্তিগুলো বিক্রির আবেদন জানায় নজরুল ইসলাম মজুমদার। এ বিষয়ে দুদকের মতামত চায় আদালত। দুদক সম্পত্তি বিক্রির জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি না দিয়ে সম্পত্তি জব্দ করার আবেদন জানায় আদালতের কাছে।
এ নিয়ে তিন দফায় নজরুল ইসলাম মজুমদারের ১ হাজার ৪০৫ কোটি টাকার সম্পত্তি ও শেয়ার জব্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ঘুষ ও দুর্নীতির মাধ্যমে ৭৮১ কোটি টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আদালতে মামলা করেছে দুদক যা বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে।
এই মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে গত ১ অক্টোবর থেকে নজরুল ইসলাম মজুমদার বর্তমানে কাসিমপুর কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন। তিনি দীর্ঘদিন এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান পদে ছিলেন।
আদালতের নথি থেকে জানা গেছে, শ্রমিকদের বকেয়া বেতন-ভাতা পরিশোধের লক্ষ্যে ৪৪ কোটি ৭৯ লাখ টাকার সম্পত্তি বিক্রির জন্য গত ২ নভেম্বর নজরুল ইসলাম মজুমদার আইনজীবীর মাধ্যমে আদালতে আবেদন জানান।
এ নিয়ে ৯ নভেম্বর মহানগর দায়রা জজ মো. সাব্বির ফয়েজের আদালতে শুনানি হয়। এ সময় দুদকের আইনজীবী আদালতকে জানান, অভিযুক্ত ব্যক্তি অবরুদ্ধ সম্পদ অবমুক্ত করার জন্য আবেদন করতে পারেন না। আবেদনটি নিষ্পত্তির জন্য দুদকের মতামত প্রয়োজন জানিয়ে আদালত ১৯ নভেম্বরের মধ্যে দুদককে এ বিষয়ে স্পষ্ট মতামত দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এই নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে সময় বাড়িয়ে নিয়ে ২৩ নভেম্বর আদালতে দুটি চিঠি পাঠান দুদকের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ শাহজাহান মিরাজ। একটি চিঠিতে এই সম্পত্তিগুলো বিক্রির জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি না দেওয়ার আবেদন জানানো হয়। আরেক চিঠিতে বিক্রির জন্য অনুমতি চাওয়া তফসিলি সম্পত্তিগুলো জব্দ করার আদেশের অনুরোধ জানায় দুদক।
চিঠিতে দুদক কর্মকর্তা লেখেন, বিক্রির জন্য আবেদন করা জমিগুলো গুলশান, আশুলিয়া ও সোনারগাঁওয়ে অবস্থিত, যা খুবই মূল্যবান। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধসহ নাসা গ্রুপের অন্যান্য পাওনাদি পরিশোধের নামে আসামি নজরুল ইসলাম মজুমদার কর্তৃক অর্জিত অবৈধ সম্পত্তিগুলো হস্তান্তর বা বিক্রি হয়ে গেলে রাষ্ট্রের সমূহ ক্ষতির কারণ রয়েছে।’
‘মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ও দুদকের বিধিমালা অনুযায়ী এই সম্পত্তিগুলো অবিলম্বে জব্দ করা আবশ্যক’, লেখা হয় দ্বিতীয় চিঠিতে।
এ নিয়ে সোমবার মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতে শুনানি হয়। শুনানিতে আদালত নজরুল ইসলাম মজুমদারের আবেদন নামঞ্জুর করে সম্পত্তিগুলো জব্দ করার জন্য দুদককে আদেশ দেন।
তৃতীয় দফায় জব্দকৃত সম্পত্তিগুলোর মধ্যে রয়েছে গুলশান আবাসিক এলাকার এ ব্লকের প্রায় ৪০ কাঠা জমি, আশুলিয়া তৈয়বপুর মৌজার প্রায় ৫ বিঘা জমি ও নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁওয়ের ১০ বিঘা জমি।
এবার সম্পত্তি বিক্রির অনুমোদন না মিললেও আগে আদালতের অনুমতি নিয়ে কয়েক ধাপে প্রায় ৭৬ কোটি টাকার সম্পত্তি ও শেয়ার বিক্রি করেন নজরুল ইসলাম মজুমদার।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের নথি অনুযায়ী, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসের বেতন-ভাতা পরিশোধের জন্য বিক্রয়লব্ধ অর্থের প্রায় ৬২ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। অন্যান্য উৎস থেকে আসা অর্থ সহ বর্তমানে নাসা গ্রুপের ব্যাংক হিসাবে ১৯ কোটি ২০ লাখ টাকা জমা আছে।
এই পরিস্থিতে ৩০ নভেম্বরের মধ্যে শ্রমিকদের সার্ভিস বেনিফিটসহ অন্যান্য পাওনা পরিশোধে আরও প্রায় ১৩৮ কোটি টাকা চেয়েছেন নাসা গ্রুপে নিযুক্ত প্রশাসক আরিফ আহমেদ।
গত ১৩ নভেম্বর মহানগর জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজের কাছে পাঠানো চিঠিতে তিনি লেখেন, সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শ্রমিক কর্মচারিদের বেতন-ভাতা ছাড়াও অর্জিত ছুটি, মাতৃত্বকালীন ছুটি, নোটিশ পে ও অন্যান্য বকেয়া পাওনাদি ৩০ নভেম্বরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এজন্য এই পরিমাণ অর্থের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন প্রশাসক।
টেক্সটাইল ও পোশাক শিল্প কারখানা নিয়ে গঠিত একসময়ের সফল পোশাক রপ্তানিকারক শিল্প গ্রুপ ছিল নাসা। গত বছরের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর থেকেই দুর্নীতির মামলায় নাসার চেয়ারম্যান কারাগারে থাকায় ২৫টি কারখানার ১৬টি বন্ধ হয়ে গেছে। অনিয়মিত হয়ে পড়ে চালু কারখানাগুলোর বেতন-ভাতা।
নাসা গ্রুপের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদার আগের সরকারের সময়ে রাজনৈতিক আনুকূল্যে ছিলেন। ওই সময়ে তার পোশাক ও বস্ত্র কারখানাগুলোও পূর্ণোদ্যমে চালু ছিল।
বর্তমানে নাসা গ্রুপের কাছে ২২টি ব্যাংক ও একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ৮ হাজার ৬৭৬ কোটি টাকা পাওনা রয়েছে।


