ভারতের রাজধানী দিল্লির সীমান্ত এলাকা থেকে লস্কর-ই-তৈয়বার এক সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে দিল্লি পুলিশের স্পেশাল সেল। শাব্বির আহমদ লোন ওরফে রাজা ওরফে কাশ্মীরি নামের এই ব্যক্তি বাংলাদেশ থেকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর নির্দেশে ভারতে বড় ধরনের নাশকতার ছক কষছিলেন বলে জানিয়েছেন ভারতীয় কর্মকর্তারা। এ খবর দিয়েছে ইন্ডিয়া টুডে।
তদন্তকারীদের মতে, এই চক্রের সাথে পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপাল জুড়ে বিস্তৃত একটি আন্তঃসীমান্ত অর্থায়ন নেটওয়ার্ক জড়িত রয়েছে।
জম্মু ও কাশ্মীরের শ্রীনগরের গান্দারবাল জেলার কাঙ্গন এলাকার বাসিন্দা শাব্বিরকে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থার সহায়তায় ২৯ মার্চ দিল্লির ঘাজিপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। সম্প্রতি দিল্লি এবং দক্ষিণ ভারতের কিছু অংশে লস্কর সংশ্লিষ্ট একটি পোস্টার লাগানো চক্রের সন্ধান পাওয়ার পরপরই এই গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটল।
গোয়েন্দাদের দাবি, ওই চক্রটি দিল্লি ও কলকাতায় ভারত-বিরোধী পোস্টার লাগিয়ে নাশকতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করছিল।
আদালত ও আইনি প্রক্রিয়া
গ্রেপ্তারের পর শাব্বিরকে দিল্লির পাতিয়ালা হাউস আদালতে হাজির করা হয়। দিল্লি পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য পাঁচ দিনের রিমান্ড আবেদন করেছে। পুলিশ আদালতকে জানায়, ভারতে এই চক্রের মূল হোতাদের শনাক্ত করতে এবং পুরো নেটওয়ার্কটি ধ্বংস করতে তাকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি। শুনানি শেষে আদালত শাব্বিরকে আইনগত সহায়তা প্রদানের নির্দেশ দেয়। একই সঙ্গে তার গ্রেপ্তারের খবর পরিবারের সদস্যদের হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে জানাতে বলে। তবে রিমান্ডের বিষয়ে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছে।
বাংলাদেশ ও নেপাল রুট ব্যবহার
গোয়েন্দা তথ্যানুযায়ী, শাব্বির দীর্ঘদিন বাংলাদেশে অবস্থান করে লস্করের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। তিনি অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে নেপাল সীমান্ত হয়ে সম্প্রতি ভারতে প্রবেশ করেন। পাকিস্তানে অবস্থানরত লস্কর হ্যান্ডলার আবু হুজাইফা, সুমামা বাবর এবং আব্দুল রেহমানের নির্দেশে তিনি ভারতে সমমনা তরুণদের রিক্রুট করার পরিকল্পনা করছিলেন। এছাড়া তিনি তেহরিক-উল-মুজাহিদিন কমান্ডার আবু তালহা এবং তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী আসিফ দারের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
পোস্টার ও রেকি কর্মকাণ্ড
পুলিশ আদালতে আরও জানায়, শাব্বির বাংলাদেশ থেকে এই জঙ্গি মডিউল পরিচালনা করে ভারতের সুপ্রিম কোর্টসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল এলাকায় ভারত-বিরোধী পোস্টার লাগানোর কাজ তদারকি করতেন। তিনি ভারতের বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনালয়ে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণও চালিয়েছিলেন। তদন্তকারীরা পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং নেপালের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের একটি নেটওয়ার্ক খুঁজে পেয়েছেন যার মাধ্যমে ভারতে জঙ্গি কার্যক্রমে অর্থায়ন করা হতো। বর্তমানে ভারতে তার স্থানীয় সহযোগীদের ধরার চেষ্টা চলছে।
প্রশিক্ষণ ও পুরনো অপরাধের ইতিহাস
ভারতের পুলিশ জানায়, শাব্বির লস্কর-ই-তৈয়বার একজন প্রশিক্ষিত সদস্য। তিনি পাকিস্তানের মুজাফফরাবাদে দলটির প্রাথমিক প্রশিক্ষণ ‘দাওরা-এ-আম’ এবং উচ্চতর প্রশিক্ষণ ‘দাওরা-এ-খাস’ সম্পন্ন করেছেন। জঙ্গি সংগঠনটির শীর্ষ নেতৃত্বের সাথে তার সম্পর্ক প্রায় দুই দশকের পুরনো। এর আগে ২০০৭ সালে একে-৪৭ রাইফেল ও গ্রেনেডসহ তিনি দিল্লির স্পেশাল সেলের হাতে ধরা পড়েছিলেন। সেই মামলায় দণ্ডিত হয়ে ২০১৮ সাল পর্যন্ত তিনি তিহার জেলে বন্দি ছিলেন। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আত্মগোপন করেন এবং পুনরায় বাংলাদেশে গিয়ে লস্কর নেটওয়ার্ক পুনর্গঠন শুরু করেন।
এই নেটওয়ার্কের নিয়োগ প্রক্রিয়া, অর্থের উৎস এবং ভারতে তাদের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে শাব্বির আহমদ লোনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ভারতের কর্মকর্তাদের মতে, এই পুরো বিষয়টি পাকিস্তান থেকে পরিচালিত এবং বাংলাদেশ থেকে অপারেশনাল সমর্থন পাওয়া একটি সুসংগঠিত আন্তঃসীমান্ত ষড়যন্ত্রের অংশ।


