গবেষণার টাকা কি সত্যিই বন্ধ, নাকি বদলেছে অর্থায়নের পথ?

গবেষণার টাকা কি সত্যিই বন্ধ, নাকি বদলেছে অর্থায়নের পথ?
Advertisement
Advertisement

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপনের পর একটি প্রশ্ন উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেছেন, চলতি অর্থবছরে গবেষণা খাতে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন (ইউজিসি) থেকে কোনো বরাদ্দ পাওয়া যায়নি। দেশের সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে এমন বক্তব্য আসার পর অনেকের মনেই স্বাভাবিক প্রশ্ন জেগেছে—তাহলে কি গবেষণার জন্য সরকারি অর্থায়ন বন্ধ হয়ে গেল?

প্রথম দৃষ্টিতে প্রশ্নটির উত্তর হয়তো ‘হ্যাঁ’ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা একটু ভিন্ন। গবেষণার জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন বন্ধ হয়নি; বরং বদলেছে তার অর্থায়নের কাঠামো। আর এই পার্থক্যটি স্পষ্ট না হলে পুরো বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষের উদ্বেগ অবশ্যই যৌক্তিক। তিনি শুধু ইউজিসির বরাদ্দ না থাকার কথা বলেননি; একই সঙ্গে উল্লেখ করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালন ব্যয়ের বড় অংশ বেতন-ভাতা ও পেনশনে ব্যয় হয়ে যায়। ফলে গবেষণা, গ্রন্থাগার উন্নয়ন, গবেষণাগারের আধুনিকায়ন এবং শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এই সংকট শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়; দেশের অধিকাংশ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েরই একই বাস্তবতা।

কিন্তু এ বছরের বাজেটে যে পরিবর্তনটি এসেছে, সেটি মূলত অর্থায়নের পদ্ধতিতে। আগে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব বাজেটে গবেষণা খাতে একটি নির্দিষ্ট বরাদ্দ পেত। একই সময়ে ইউজিসিও আলাদাভাবে গবেষণা অনুদান দিত। ফলে একই খাতে দুটি পৃথক অর্থায়ন ব্যবস্থা চালু ছিল। এবার সেই দ্বৈততা দূর করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের বরাদ্দ কেন্দ্রীয়ভাবে ইউজিসির গবেষণা তহবিলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে আগের মতো গবেষণা বরাদ্দ দেখা না গেলেও গবেষণার জন্য নির্ধারিত অর্থ রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে বাদ যায়নি।

এই পরিবর্তনের ফলে ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে ইউজিসির গবেষণা ও বৈদেশিক স্কলারশিপ খাতে মোট ২৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা খাতের স্থানান্তরিত অর্থও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ গবেষণায় অর্থ নেই—এ কথা তথ্যগতভাবে সঠিক নয়। বরং অর্থ বণ্টনের ধরন পরিবর্তন হয়েছে।

প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তন কি গবেষণার জন্য ইতিবাচক হবে?

বিশ্বের অনেক দেশেই গবেষণা অনুদান কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত হয়। গবেষকের প্রতিষ্ঠানের নাম নয়, গুরুত্ব পায় গবেষণা-প্রস্তাবের মান, জাতীয় প্রয়োজন, সম্ভাব্য সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং উদ্ভাবনী সক্ষমতা। প্রতিযোগিতাভিত্তিক এই পদ্ধতি উৎকর্ষের সংস্কৃতি তৈরি করে এবং সীমিত সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে। বাংলাদেশেও যদি একই নীতিতে গবেষণা তহবিল পরিচালিত হয়, তাহলে এটি ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে।

আরও পড়ুন

তবে এখানেই সবচেয়ে বড় শর্তটি রয়েছে। গবেষণা কেবল অর্থের ওপর নির্ভর করে না; নির্ভর করে সময়মতো অর্থ ছাড়, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতার ওপর। কেন্দ্রীয় তহবিল যদি নতুন করে জটিলতা সৃষ্টি করে, অনুদান অনুমোদনে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দেয় বা মূল্যায়ন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তাহলে কাঠামো বদলালেও গবেষণার বাস্তব চিত্র বদলাবে না।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ গবেষণার পরিবেশ। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবী শিক্ষক ও গবেষকের অভাব নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাগার, আধুনিক যন্ত্রপাতি, দক্ষ গবেষণা সহকারী, শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা এবং গবেষণালব্ধ জ্ঞানকে প্রযুক্তি বা পণ্যে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা এখনো সীমিত। তাই শুধু অর্থায়নের পদ্ধতি বদলালেই হবে না, গবেষণার পুরো ইকোসিস্টেমকে শক্তিশালী করতে হবে।

বাংলাদেশের উন্নয়নের অভিজ্ঞতাও দেখায়, গবেষণায় বিনিয়োগ কখনো অপচয় নয়। কৃষিতে উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের উৎপাদন বৃদ্ধি, ওষুধশিল্পের বিকাশ কিংবা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি—এসবই দীর্ঘদিনের গবেষণা ও উদ্ভাবনের ফল। গবেষণার সুফল তাৎক্ষণিকভাবে দৃশ্যমান হয় না, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সেটিই অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং মানুষের জীবনমান বদলে দেয়।

এ কারণেই গবেষণাকে ব্যয় হিসেবে নয়, ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা উচিত। যে দেশ গবেষণায় বিনিয়োগ করে, সেই দেশই নতুন প্রযুক্তি সৃষ্টি করে, শিল্পে প্রতিযোগিতা বাড়ায় এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে তোলে। বাংলাদেশকেও সেই পথেই এগোতে হবে।

ইউজিসি জানিয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষার অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ করে গবেষণা অনুদান বণ্টনের জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করা হবে। গবেষণার সম্ভাব্য প্রভাব, গুণগত মান এবং জাতীয় অগ্রাধিকার বিবেচনায় অনুদান দেওয়া হবে। নীতিগতভাবে এটি একটি ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে নীতির সফলতা নির্ভর করবে তার বাস্তবায়নের ওপর। অনুদান বণ্টনে স্বচ্ছতা, স্বাধীন মূল্যায়ন, সময়মতো অর্থ ছাড় এবং জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে ভালো নীতিও প্রত্যাশিত ফল দেবে না।

তাই আজকের বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত নয়—গবেষণার টাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাজেটে আছে, নাকি ইউজিসির বাজেটে। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, সেই অর্থ কত দ্রুত, কত স্বচ্ছভাবে এবং কতটা মেধাভিত্তিক প্রক্রিয়ায় গবেষকের হাতে পৌঁছায়। কারণ শেষ পর্যন্ত বাজেটের অঙ্ক নয়, গবেষণার ফলই একটি দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে। গবেষণার অর্থায়নের পথ বদলেছে—এখন প্রয়োজন সেই পথকে এমনভাবে পরিচালনা করা, যাতে প্রতিটি বরাদ্দ নতুন জ্ঞান, নতুন প্রযুক্তি এবং জাতীয় উন্নয়নের নতুন সম্ভাবনায় রূপ নেয়। সেটিই হবে এই নীতিগত পরিবর্তনের প্রকৃত সাফল্য।

আশার খবর, নতুন এই ব্যবস্থায় নীতিগতভাবে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা বরাদ্দ কমানো হচ্ছে না।

লেখক: ইমরান হোসেন, সিনিয়র সহকারী পরিচালক, ইউজিসি

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
ইমরান হোসেন
ইমরান হোসেন

সিনিয়র সহকারী পরিচালক, জনসংযোগ ও প্রকাশনা বিভাগ, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন

সম্পর্কিত খবর