শান্ত জনপদ হঠাৎ করেই যেন এক থ্রিলার সিনেমার সেট! দক্ষিণ কোরিয়ার দেজন শহরের অলিগলি এখন এক অজানা আতঙ্কে থমথমে। একটি খাঁচাবন্দি নেকড়ের পালিয়ে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়তেই চারদিকে হুলস্থুল পড়ে গেছে। নিরাপত্তার খাতিরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুল। বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, ‘পলাতক’ নেকড়েকে এখন হন্যে হয়ে খুঁজছেন প্রায় তিনশ’ নিরাপত্তা কর্মী।
যেভাবে শুরু এই রোমাঞ্চ
ঘটনার সূত্রপাত বুধবার। সিউল থেকে প্রায় ১৫০ কিলোমিটার দূরে দেজন শহরের ‘ও-ওয়ার্ল্ড’ থিম পার্কের চিড়িয়াখানা থেকে পালিয়ে যায় এক বছর বয়সী একটি পুরুষ নেকড়ে। ওজন তার প্রায় ৩০ কেজি। জানা গেছে, কৌশলে চিড়িয়াখানার বেষ্টনী খুঁড়ে মুক্ত বাতাসে বেরিয়ে পড়ে সে। সিসিটিভি ফুটেজ আর স্থানীয়দের ক্যামেরায় তাকে মাঝেমধ্যেই রাস্তায় ঘুরতে দেখা যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের মনে কাঁপন ধরিয়ে দিয়েছে।
তল্লাশিতে সেনাবাহিনী ও ড্রোন
বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই নেকড়েটি ধরতে চিরুনি অভিযানে নেমেছে পুলিশ, দমকল বাহিনী এবং সামরিক বাহিনীর প্রায় ৩০০ সদস্য। আকাশে ওড়ানো হয়েছিল অত্যাধুনিক ড্রোন ক্যামেরা। কিন্তু বাঁধ সাধল আবহাওয়া। বৃষ্টির কারণে ড্রোনগুলো সরিয়ে নিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। দেজন ফায়ার হেডকোয়ার্টারের এক কর্মকর্তা জানান, বৃষ্টির জন্য উদ্ধারকাজ কিছুটা ব্যাহত হলেও তারা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এদিকে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে ‘দেজন সানসেং এলিমেন্টারি স্কুল’ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
প্রাণীটির নাম ‘নেউগু’: হত্যা নাকি উদ্ধার?
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এবং পরিবেশ দপ্তর জানিয়েছে, তাদের প্রথম লক্ষ্য হলো নেকড়েটিকে জীবিত ধরা। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতায় শিকারিদের মোতায়েন করায় শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন প্রাণিপ্রেমীরা। ‘অ্যানিমেল ফ্রিডম সলিডারিটি’ নামের একটি সংগঠন দাবি করেছে, এই ঘটনার জন্য নেকড়েটি দায়ী নয়, বরং চিড়িয়াখানার অব্যবস্থাপনাই দায়ী। তারা ২০১৮ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দিয়ে বলেন, সেবার ‘পোরোঙ্গি’ নামে একটি পুমাকে লোকালয়ে আসার ‘অপরাধে’ গুলি করে মারা হয়েছিল। তারা চায় না নেউগুর পরিণতিও তেমন হোক।
চিড়িয়াখানার গাফিলতি নিয়ে ক্ষোভ
পলাতক নেকড়ের কারণে ও-ওয়ার্ল্ড বর্তমানে তাদের কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। ‘গোম বোগুমজারি প্রজেক্ট’ নামের একটি সংগঠন অভিযোগ করেছে, চিড়িয়াখানায় ন্যূনতম নিরাপত্তা বিধিও মানা হয়নি। তাদের মতে, অন্তত দুজন কর্মী একসঙ্গে ডিউটি করার কথা থাকলেও সেখানে অবহেলা করা হয়েছে, যার সুযোগ নিয়ে নেকড়েটি পালাতে সক্ষম হয়েছে।
ফিরে আসছে ‘সেরো’র স্মৃতি
গত বছর সিউলের রাস্তায় একটি জেব্রা (নাম সেরো) পালিয়ে এসে বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত তাকে অক্ষত অবস্থায় ট্রাঙ্কুইলাইজারের মাধ্যমে ধরে চিড়িয়াখানায় ফেরত নেওয়া হয়েছিল। এখন দক্ষিণ কোরিয়াবাসীর প্রার্থনা একটাই—নেউগুও যেন কোনো মানুষের ক্ষতি না করে আবার নিজের ঠিকানায় নিরাপদে ফিরে যেতে পারে।


