বর্জ্য সংগ্রহে অনিয়ম, অতিরিক্ত অর্থ আদায়, নির্ধারিত সময়ে ময়লা অপসারণ না করা কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের আচরণ নিয়ে অভিযোগ জানাতে এখন আর সিটি করপোরেশনের দপ্তরে যেতে হবে না। কয়েকটি ক্লিকেই নাগরিকরা সরাসরি অভিযোগ জানাতে পারবেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কাছে। সেই লক্ষ্যেই ‘ক্লিন কেয়ার’ নামে একটি মোবাইল অ্যাপ চালু করেছে সংস্থাটি।
মঙ্গলবার দুপুর ১২টায় নগর ভবনের অডিটোরিয়ামে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অ্যাপটির উদ্বোধন করেন ডিএসসিসির প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আব্দুস সালাম। অনুষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার, বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ডিএসসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, অ্যাপটি শুধু অভিযোগ গ্রহণের একটি প্ল্যাটফর্ম নয়; বরং বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে তথ্যনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থায় রূপান্তরের একটি উদ্যোগ। এর মাধ্যমে নাগরিকদের অভিযোগ, সেবার মান এবং বিভিন্ন এলাকার সমস্যার ধরন বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রেও সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
অনুষ্ঠানে প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহাবুবুর রহমান তালুকদার বলেন, বর্তমানে অনেক নাগরিক জানেন না বর্জ্য ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত সমস্যার অভিযোগ কোথায় করতে হবে। ফলে অনেক অভিযোগই অমীমাংসিত থেকে যায়। নতুন অ্যাপের মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান হবে।
তিনি বলেন, কেউ যদি নির্ধারিত হারের চেয়ে বেশি বর্জ্য ফি আদায়ের অভিযোগ করতে চান অথবা নিয়মিত ময়লা অপসারণ না করার বিষয়ে অভিযোগ জানাতে চান, তাহলে অ্যাপের নির্দিষ্ট অপশনে গিয়ে সহজেই অভিযোগ করতে পারবেন। অভিযোগ জমা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে অভিযোগকারী একটি নোটিফিকেশন পাবেন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির তথ্যও দেখতে পারবেন।
প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা বলেন, ‘আজকে যদি কোনো অভিযোগ আসে এবং তা নির্ধারিত সময়ে সমাধান না হয়, তাহলে সেটি আমাদের প্রশাসক, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নজরে চলে আসবে। প্রতিদিন কতটি অভিযোগ এসেছে, কতটি নিষ্পত্তি হয়েছে এবং কতটি বাকি আছে—সব তথ্য আমরা তাৎক্ষণিকভাবে দেখতে পারব।’
তার ভাষ্য, অ্যাপটির মাধ্যমে শুধু অভিযোগ নিষ্পত্তিই নয়, একটি সমন্বিত ডেটাবেজও তৈরি হবে। কোন এলাকায় কী ধরনের সমস্যা বেশি, কোথায় সেবার ঘাটতি রয়েছে কিংবা কোথায় অতিরিক্ত জনবল বা বরাদ্দ প্রয়োজন—এসব বিষয় তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে নির্ধারণ করা যাবে।
তিনি আরও জানান, অভিযোগ নিষ্পত্তির পর ব্যবহারকারীরা এক থেকে পাঁচ তারকা পর্যন্ত রেটিং দিতে পারবেন। এর মাধ্যমে সেবার মান মূল্যায়ন করা সহজ হবে। পাশাপাশি নাগরিকদের জন্য বিশেষ বিজ্ঞপ্তি ও জরুরি তথ্যও অ্যাপের মাধ্যমে প্রচার করা হবে।
নাগরিক অংশগ্রহণ ছাড়া সফলতা আসবে না
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডিএসসিসির প্রশাসক মো. আব্দুস সালাম বলেন, আধুনিক বিশ্বে প্রযুক্তিনির্ভর সেবার কোনো বিকল্প নেই। উন্নত দেশগুলো বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে শুধু পরিচ্ছন্নতার বিষয় হিসেবে নয়, বরং তথ্যভিত্তিক প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার অংশ হিসেবে পরিচালনা করছে।
তিনি বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার সিউল, সিঙ্গাপুর, সান ফ্রান্সিসকোসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় প্রযুক্তি, তথ্য বিশ্লেষণ ও স্মার্ট সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনও সেই ধারায় যুক্ত হতে চায়।
প্রশাসক বলেন, ‘একটি আধুনিক শহর শুধু প্রশাসনের একার প্রচেষ্টায় গড়ে তোলা সম্ভব নয়। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো উদ্যোগ সফল হবে না। জনগণের দায়িত্ব ৫০ শতাংশ, সিটি করপোরেশনের দায়িত্বও ৫০ শতাংশ।’
তিনি গণমাধ্যমকর্মীদের উদ্দেশে বলেন, নাগরিকদের সচেতন করার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। অ্যাপটি সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হলে এর সুফল দ্রুত পাওয়া যাবে।
দুই মাস শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনায়
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক জানান, প্রাথমিকভাবে অ্যাপটি শুধু বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য ব্যবহার করা হবে। প্রথম এক থেকে দুই মাস এর কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। এরপর ধাপে ধাপে মশক নিয়ন্ত্রণ, রাস্তা, ড্রেনেজ, বিদ্যুৎসহ অন্যান্য নাগরিক সেবাও একই প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘প্রথমে আমরা দেখতে চাই সিস্টেমটি কতটা কার্যকর হয়। কোথায় কী ত্রুটি আছে, ব্যবহারকারীরা কী ধরনের অভিজ্ঞতা পাচ্ছেন, সেগুলো বুঝে নেওয়ার পর আমরা অন্যান্য সেবা যুক্ত করব।’
প্রশাসক আরও জানান, অ্যাপটি তৈরিতে সহযোগিতাকারী প্রতিষ্ঠান প্রথম ছয় মাস সিটি করপোরেশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগকে প্রযুক্তিগত সহায়তা দেবে। পরে পুরো ব্যবস্থাপনা ডিএসসিসির নিজস্ব আইসিটি বিভাগ পরিচালনা করবে। অ্যাপটির মালিকানাও সম্পূর্ণভাবে সিটি করপোরেশনের।
অভিযোগ বাড়বে, তবে সমস্যা জানাও জরুরি
অ্যাপ চালুর ফলে অভিযোগের সংখ্যা বেড়ে গেলে তা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে প্রশাসক বলেন, অভিযোগ বাড়া মানেই সমস্যাগুলো দৃশ্যমান হওয়া। তিনি বলেন, ‘সমস্যা এড়িয়ে গেলে তো সমাধান হবে না। আগে অনেক সমস্যাই সামনে আসত না। এখন মানুষ অভিযোগ করবে, সমস্যাগুলো সামনে আসবে, আমরা সেগুলোর সমাধানের চেষ্টা করব।’
বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় জনবল ও যান্ত্রিক সক্ষমতার ঘাটতির কথা স্বীকার করে তিনি বলেন, এসব সীমাবদ্ধতা এক দিনে দূর করা সম্ভব নয়। তবে ধাপে ধাপে সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা ও সমন্বয়হীনতার প্রসঙ্গ
নগরের জলাবদ্ধতা ও বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয়হীনতার বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক বলেন, ‘এসব সমস্যা দীর্ঘদিনের এবং রাতারাতি সমাধান সম্ভব নয়। আমি দায়িত্ব নেওয়ার শুরুতেই বলেছি, আমাকে অন্তত দুই বছর সময় দিতে হবে। নতুন যুক্ত হওয়া ১৮টি ওয়ার্ডে এখনো পর্যাপ্ত ড্রেনেজ, রাস্তা কিংবা আলোকসজ্জা নেই। এগুলো ধাপে ধাপে উন্নয়ন করতে হবে।’
জলাবদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথগুলো বছরের পর বছর সংকুচিত হয়েছে। অনেক খাল ও জলাধার ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারে না। বর্তমানে কোথায় পানি জমে, কেন জমে এবং কীভাবে স্থায়ী সমাধান করা যায়, সে বিষয়ে সমীক্ষা ও পরিকল্পনা চলছে।
তার দাবি, চলতি বছর পুরোপুরি জলাবদ্ধতা দূর করা না গেলেও পানি জমে থাকার সময় কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। এ জন্য বিভিন্ন এলাকায় পাম্প স্থাপনসহ কয়েকটি উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
ফ্লাইওভারের নিচে বর্জ্যের স্তূপ নিয়ে প্রশ্ন
ফ্লাইওভারের নিচে ও সড়কের পাশে উন্মুক্তভাবে বর্জ্য রাখার বিষয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে প্রশাসক বলেন, বিষয়টি সিটি করপোরেশনের নজরে রয়েছে। এসব স্থানে বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং কয়েকটি এলাকায় সৌন্দর্যবর্ধনের অংশ হিসেবে বাগান তৈরির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে এসব সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কিছুটা সময় লাগবে।
অনুষ্ঠানের শেষে প্রশাসক আনুষ্ঠানিকভাবে ‘ক্লিন কেয়ার’ অ্যাপের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। একই সঙ্গে নগরবাসীকে অ্যাপটি ব্যবহার করে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা–সংক্রান্ত সমস্যা জানাতে এবং পরিচ্ছন্ন নগর গঠনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।


