চলতি বিশ্বকাপে রেফারিং নিয়ে চলছে নানামুখী সমালোচনা। সর্বশেষ আর্জেন্টিনা-মিসরের ম্যাচে পেনাল্টি-ফাউল ইত্যাদি নিয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন মিসরের কোচ। তবে এবারই প্রথম নয়, রেফারিং নিয়ে বিতর্ক অতীতেও ছিল। আসুন জেনে নেই তেমনই কয়েকটি বড় রেফারিং কেলেঙ্কারির ঘটনা।
১৯৯০: কোডেসাল বনাম আর্জেন্টিনা
১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানি ও আর্জেন্টিনার মধ্যকার ম্যাচটি ফুটবলের নান্দনিকতার চেয়ে রেফারির বিতর্কিত বাঁশির জন্য বেশি স্মরণীয় হয়ে আছে। ম্যাচের শুরু থেকেই মেক্সিকান রেফারি কোডেসালের বেশ কিছু সিদ্ধান্ত আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যায়। ম্যাচের ৬৫ মিনিটে আর্জেন্টিনার পেদ্রো মোনজনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান তিনি, যা ছিল বিশ্বকাপ ফাইনালের ইতিহাসে প্রথম লাল কার্ডের ঘটনা। তবে আসল নাটকের তখনও বাকি ছিল। ম্যাচের ৮৫ মিনিটে জার্মানির রুডি ফোলার আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সের ভেতর পড়ে গেলে রেফারি জার্মানির পক্ষে বিতর্কিত এক পেনাল্টির বাঁশি বাজান। ভিডিও রিপ্লেতে স্পষ্ট দেখা যায়, আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার রবার্তো সেনসিনির চ্যালেঞ্জটি অত্যন্ত নিখুঁত ছিল এবং তিনি বলই স্পর্শ করেছিলেন, ফোলারকে ফাউল করেননি।
এই পেনাল্টির সিদ্ধান্তে আর্জেন্টিনার ফুটবলাররা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং রেফারির সাথে তীব্র তর্কে জড়ান। প্রতিবাদ করায় আর্জেন্টিনার গুস্তাভো দেজোত্তিকেও দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠছাড়া করেন কোডেসাল। পেনাল্টি থেকে আন্দ্রেয়াস ব্রেহমের করা একমাত্র গোলে পশ্চিম জার্মানি চ্যাম্পিয়ন হয়।
ম্যাচ শেষে ডিয়েগো ম্যারাডোনা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং সরাসরি অভিযোগ করেন যে, আর্জেন্টিনাকে চ্যাম্পিয়ন হতে না দেওয়ার জন্য এটি ফিফার একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র ছিল। রেফারি কোডেসালের সেই একটি পেনাল্টির সিদ্ধান্ত ১৯৯০ বিশ্বকাপের ফাইনালকে আজো কলঙ্কিত করে রেখেছে।
মজার বিষয়, রেফারি কোডেসালের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে নিন্দা প্রস্তাব এনেছিলেন এক সংসদ সদস্য।
১৯৬৬ সালের ‘ঘোস্ট গোল’
বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় এবং অমীমাংসিত বিতর্কগুলোর একটি ঘটেছিল ১৯৬৬ সালের ইংল্যান্ড বিশ্বকাপের ফাইনালে। মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক ইংল্যান্ড ও পশ্চিম জার্মানি। নির্ধারিত সময়ের খেলা ২-২ গোলে সমতায় থাকার পর ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। ম্যাচের ১০১ মিনিটে ইংল্যান্ডের স্ট্রাইকার জিওফ হার্স্টের একটি শট জার্মানির গোলবারের ক্রসবারে লেগে গোললাইনের ঠিক ওপরে বা কাছাকাছি ড্রপ খেয়ে ফিরে আসে। গোল হয়েছে কি হয়নি, তা নিয়ে যখন মাঠের খেলোয়াড়রা দ্বিধাদ্বন্দ্বে, তখন সুইস রেফারি গটফ্রিড ডিনস্ট লাইন্সম্যান তৌফিক বাখরামভের সঙ্গে পরামর্শ করে এটিকে গোল বলে ঘোষণা করেন। জার্মান ফুটবলাররা তীব্র প্রতিবাদ জানালেও সিদ্ধান্ত বদলায়নি। পরে আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে বিশ্লেষকেরা দাবি করেন, বলটি সম্পূর্ণভাবে গোললাইন অতিক্রম করেনি। এই ‘ঘোস্ট গোল’ ইংল্যান্ডকে এগিয়ে দেয় এবং শেষ পর্যন্ত তারা ৪-২ ব্যবধানে চ্যাম্পিয়ন হয়।
১৯৮৬ সালের মহাবিতর্কিত ‘ঈশ্বরের হাত’
ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত, বিতর্কিত এবং একই সাথে রোমাঞ্চকর ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে। আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যকার কোয়ার্টার ফাইনাল ম্যাচটি ছিল ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনায় ঠাসা। কারণ ফকল্যান্ড যুদ্ধের কারণে দেশ দুটি ছিল একে অপরের চরম শত্রু। ম্যাচের ৫১ মিনিটে আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডিয়েগো ম্যারাডোনা ইংল্যান্ডের গোলরক্ষক পিটার শিল্টনের দিকে ছুটে আসা একটি বলকে হেড করার ভঙ্গি করে নিজের বাম হাত দিয়ে আলতো টোকায় জালের ভেতর পাঠিয়ে দেন। ইংলিশ ডিফেন্ডার ও গোলরক্ষক হাত দিয়ে গোল করার বিষয়টি নিয়ে রেফারির কাছে ছুটে যান। কিন্তু তিউনিসিয়ান রেফারি আলি বিন নাসের ম্যারাডোনার চাতুর্য ধরতে পারেননি। তিনি এটি বৈধ গোল হিসেবে ঘোষণা করেন।
ম্যাচ শেষে ম্যারাডোনা নিজেই রসিকতা করে বলেছিলেন, গোলটি কিছুটা ম্যারাডোনার মাথা আর কিছুটা ঈশ্বরের হাতের ছোঁয়ায় হয়েছিল।
২০০২ সালের দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির মহানাটক
রেফারিংয়ের মান নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্নের জন্ম দিয়েছিল ২০০২ সালের কোরিয়া-জাপান বিশ্বকাপ। বিশেষ করে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির মধ্যকার দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি ছিল চরম নাটকীয়তায় ভরা। ইকুয়েডরিয়ান রেফারি বায়রন মোরেনোর বেশ কিছু সিদ্ধান্ত ফুটবল বিশ্বকে হতবাক করে দেয়। পুরো ম্যাচজুড়ে কোরিয়ান ফুটবলারদের একের পর এক ফাউল রেফারির চোখ এড়িয়ে যায়। উল্টো ইতালির তারকা ফ্রান্সেসকো তোত্তিকে বক্সের মধ্যে ফাউল করার পর পেনাল্টি না দিয়ে, ডাইভিংয়ের কাল্পনিক অভিযোগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড তথা লাল কার্ড দেখিয়ে মাঠ থেকে বের করে দেওয়া হয়। এখানেই শেষ নয়, অতিরিক্ত সময়ে ইতালির দামিয়ানো তোমাজির একটি বৈধ গোলকে অফসাইডের অজুহাতে বাতিল করেন রেফারি। শেষ পর্যন্ত ইতালি ম্যাচটি হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নেয়।
একজনকেই তিনবার হলুদ কার্ড!
এক ফুটবল ম্যাচে কোনো খেলোয়াড় দুবার হলুদ কার্ড দেখলে তাকে দ্বিতীয় হলুদ কার্ডের সঙ্গেই লাল কার্ড দেখানো হয়। কিন্তু ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের এমন এক ভুল হয়েছিল যা হাস্যরসের জন্ম দেয়। গ্রুপ পর্বের ম্যাচে ক্রোয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার লড়াইয়ে বাঁশি মুখে মাঠে নেমেছিলেন ইংলিশ রেফারি গ্রাহাম পোল। ম্যাচের ৬১ মিনিটে ক্রোয়েশিয়ার ডিফেন্ডার জোসিপ শিমুনিচকে প্রথম হলুদ কার্ড দেখান তিনি। এরপর ৯০ মিনিটে একটি ফাউলের জন্য শিমুনিচকে দ্বিতীয়বার হলুদ কার্ড দেখান পোল। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনি তখন লাল কার্ড দেখাতে ভুলে যান। ফলে শিমুনিচও মাঠে খেলা চালিয়ে যান। ম্যাচ শেষের বাঁশি বাজার মুহূর্তে শিমুনিচ আবার রেফারির সাথে তর্কে জড়ালে রেফারি তাকে তৃতীয়বারের মতো হলুদ কার্ড দেখানোর পাশাপাশি লাল কার্ড দিয়ে মাঠের বাইরে পাঠান। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে অত্যন্ত অভিজ্ঞ এই রেফারি পরবর্তীতে নিজের এই ঐতিহাসিক ভুলের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন।
২০১০ সালের ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের ‘অদৃশ্য’ গোল
১৯৬৬ সালের সেই বিতর্কিত গোলের ঠিক বিপরীত এক ট্র্যাজেডির শিকার হতে হয়েছিল ইংল্যান্ডকে ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপে। দ্বিতীয় রাউন্ডের হাইভোল্টেজ ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী জার্মানি ও ইংল্যান্ড। জার্মানি যখন ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে, তখন ইংলিশ মিডফিল্ডার ফ্রাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের একটি দূরপাল্লার শট জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারকে পরাস্ত করে ক্রসবারে লেগে গোললাইনের বেশ খানিকটা ভেতরে ড্রপ খায়। খালি চোখেই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছিল বলটি গোললাইন পার হয়েছে, এমনকি নয়্যার নিজেও বলটি ভেতর থেকে কুড়িয়ে এনে দ্রুত খেলা শুরু করেন। কিন্তু উরুগুইয়ান রেফারি হোর্হে ল্যারিন্ডা এবং তার সহকারী লাইন্সম্যানের চোখে তা ধরা পড়েনি। তারা খেলা চালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সমতায় ফেরার সুবর্ণ সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়ে ইংল্যান্ড মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে এবং ম্যাচটি ৪-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেয়।
এই বিশাল ভুলের পরেই বিশ্ব ফুটবলে গোললাইন প্রযুক্তি চালুর দাবি তীব্র রূপ নেয়।
২০০২ সালে স্পেনের ট্র্যাজেডি
২০০২ বিশ্বকাপে রেফারিংয়ের নাটকের শিকার কেবল ইতালিই হয়নি, কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক দক্ষিণ কোরিয়ার মুখোমুখি হয়ে স্পেনের কপালও পুড়েছিল একই কারণে। মিশরীয় রেফারি গামাল আল-গান্দুরের পরিচালনায় সেই ম্যাচে স্পেনের দুটি সম্পূর্ণ বৈধ গোল বাতিল করে দেওয়া হয়। প্রথমত, একটি ফ্রি-কিক থেকে কোরিয়ান ডিফেন্ডারের গায়ে লেগে বল জালে জড়ালে রেফারি ফাউলের অজুহাতে গোল দেননি। দ্বিতীয়ত, অতিরিক্ত সময়ে জোয়াকিনের ক্রস থেকে মোরিয়েন্তেস চমৎকার হেডে গোল করলেও সহকারী রেফারি ভুল সংকেত দেন যে, ক্রস করার আগেই বলটি সাইডলাইন অতিক্রম করেছিল। অথচ ভিডিও রিপ্লেতে দেখা যায় বলটি লাইনের ভেতরেই ছিল। স্পেনের আক্রমণভাগকে একের পর এক অফসাইডের ভুল ফাঁদে ফেলে ম্যাচটি টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং স্পেন টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যায়, যা আজো স্প্যানিশ ফুটবল ভক্তদের মনে ক্ষোভের আগুন জ্বালায়।


