আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামের সবুজ ঘাসে তখন উৎসবের নীল-সাদা জোয়ার। খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে ৩-২ গোলের মহাকাব্যিক এক জয়ে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করেছে বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। কিন্তু মুদ্রার ওপিঠে তখন জ্বলছিল পুঞ্জীভূত ক্ষোভ আর এক বুক হতাশা। ২-০ গোলে এগিয়ে থেকেও ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার এই ক্ষত সহজে শুকানোর নয় মিশরের। তবে এই হারের পেছনে শুধু নিজেদের দুর্ভাগ্যের চেয়ে রেফারির বাঁশিকেই বড় করে দেখছেন মিশরীয় ফরোয়ার্ড মোস্তফা জিকো। ম্যাচ শেষে মাঠ ছাড়ার সময় বিস্ফোরক সব মন্তব্য করে রেফারিকে সরাসরি কাঠগড়াতেই দাঁড় করিয়ে দিলেন এই স্ট্রাইকার।
খেলার মাঠে লড়াইটা ছিল সমানে-সমান, কিন্তু মাঠের বাইরে জিকোর ক্ষোভ যেন এক আগ্নেয়গিরি। স্পষ্ট পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, ‘রেফারি মোটেও ভালো ছিলেন না, তিনি স্পষ্ট অন্যায় করেছেন। তার পক্ষপাতিত্ব একেবারে নগ্ন ছিল। ম্যাচের শুরু থেকে তিনি আমাদের ওপর চড়াও হয়েছিলেন। তিনি কোনোভাবে চাননি আমরা জিতি। এই ম্যাচটি আসলে আগে থেকেই সাজানো ছিল।’
ম্যাচের ৫৮ মিনিটে জিকো যখন পাল্টা আক্রমণ থেকে বল জালে পাঠিয়েছিলেন, তখন উল্লাসে মেতেছিল পুরো মিশর শিবির। কিন্তু ভিএআর প্রযুক্তির চুলচেরা বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিল্ড-আপের সময় আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজকে ফাউল করেছিলেন তিনি। ফলে গোলটি বাতিল হয়। যদিও এর আট মিনিট পর জিকোই গোল করে দলকে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে নিয়েছিলেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিওনেল মেসি ও এনজো ফার্নান্দেজদের টর্নেডো আক্রমণের সামনে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে আফ্রিকার প্রতিনিধিদের স্বপ্ন।
বুকভরা কষ্ট নিয়ে সমর্থকদের কাছে ক্ষমা চেয়ে জিকো যোগ করেন, ‘সমর্থকদের মুখে হাসি ফোটাতে খুব চেয়েছিলাম, কিন্তু আমি ক্ষমা চাচ্ছি। পারলাম না। এতে আমাদের কোনো দোষ ছিল না। এই রেফারি… মনে হচ্ছে ম্যাচটি আগে থেকে নির্ধারিত ছিল। আমরা ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে ছিলাম, আর তিনি একের পর এক সিদ্ধান্ত আমাদের বিপক্ষে দিচ্ছিলেন। পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, আর্জেন্টিনার আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের জন্য আগাম অভিনন্দন জানানোই যায়।’
বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের শক্তির গভীরতা নিয়ে অবশ্য কোনো সংশয় ছিল না মিশরের। জিকোও অকপটে স্বীকার করেছেন যে তারা জানতেন বিশ্বের অন্যতম সেরা এবং শিরোপার প্রধান দাবিদার দলের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিলেন। লড়াইয়ের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা ম্যাচটিকে শেষ হয়ে গেছে বলে ভাবেননি। কিন্তু মাঠের ভেতরের ফুটবলের চেয়ে মাঠের বাইরের সিদ্ধান্তগুলোই যেন ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিয়েছে–এমনটাই বিশ্বাস এই ফরোয়ার্ডের। ক্ষোভ উগরে দিয়ে জিকো শেষ করেন এভাবে, ‘তারা যদি শুধু নিজেদের যোগ্যতায় এবং মাঠের লড়াইয়ে জিতত, তবে আমাদের অনুভূতিটা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো।’
বিতর্ক আর রোমাঞ্চের এই রোলারকোস্টার ম্যাচ শেষ করে লিওনেল স্কালোনির দল যখন শেষ আটের ছক কষছে, মিশর তখন পুড়ছে একরাশ আক্ষেপ আর অন্যায়ের যন্ত্রণায়। মাঠের সেই উত্তাপ এখন ছড়িয়ে পড়েছে ফুটবলবিশ্বের আলোচনার টেবিলেও।


