কিউ-ক্যাশের প্রযুক্তি সরবরাহকারী কম্পাস প্লাস (গ্রেট ব্রিটেন) লিমিটেড সফটওয়্যার লাইসেন্স বন্ধ করে দেওয়ার পর দেশের ৩০টির বেশি ব্যাংকের কার্ড ও ইলেকট্রনিক লেনদেনে প্রায় ৪৮ ঘণ্টার বিপর্যয় দেখা দেয়। টাইমস অব বাংলাদেশের হাতে আসা নথিপত্রে এ তথ্য উঠে এসেছে।
দীর্ঘদিনের বকেয়া ও অন্য চুক্তিভঙ্গের অভিযোগে প্রায় দুই দশকের ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ করার পর যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠানটি গত ৪ অক্টোবর সন্ধ্যায় আইটি কনসালট্যান্টস পিএলসির (আইটিসি) পেমেন্ট প্রসেসিং সফটওয়্যারের লাইসেন্স বাতিল করে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সূত্রগুলো টাইমসকে জানিয়েছে, আইটিসির কাছে কম্পাস প্লাসের দাবি করা জমে থাকা পাওনার পরিমাণ পাঁচ লাখ ডলারের বেশি।
কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কের অপারেটর আইটিসি তখন কম্পাস প্লাসের প্ল্যাটফর্ম থেকে বেলজিয়ামভিত্তিক ওপেনওয়ে গ্রুপের পেমেন্ট সুইচ প্ল্যাটফর্ম ওয়েফোরে স্থানান্তরের প্রস্তুতি নিচ্ছিল।
সেপ্টেম্বরের শেষদিকে আইটিসি সদস্য ব্যাংকগুলোকে জানিয়েছিল, ২৯ অক্টোবর এই সিস্টেম মাইগ্রেশন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
টাইমসকে দেওয়া লিখিত জবাবে কম্পাস প্লাস জানায়, জুলাইয়ে তারা আইটিসিকে অন্তত বকেয়ার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিশোধ এবং প্রতিযোগী সরবরাহকারীকে সহায়তা না করা-সংক্রান্ত ধারাসহ চুক্তির অন্য শর্ত মানার জন্য সতর্ক করেছিল।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আইটিসি সমস্যাগুলোর সমাধান করেনি। এরপর ২ অক্টোবর চুক্তি বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয় এবং দুই দিন পর সফটওয়্যার লাইসেন্স প্রত্যাহার করে আইটিসির প্রবেশাধিকার বন্ধ করা হয়।
এরপরই কিউ-ক্যাশ নেটওয়ার্কে দেশজুড়ে লেনদেন বিঘ্নিত হয়। ৩০টির বেশি ব্যাংকের গ্রাহক কার্ড ও অন্য ইলেকট্রনিক লেনদেনে সমস্যায় পড়েন, কিছু ক্ষেত্রে কার্ড লেনদেন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়।
গত মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ করে আইটিসি ও কম্পাস প্লাসকে আলোচনায় আনে। পরে দুই পক্ষ চলমান বাণিজ্যিক ও চুক্তিগত বিরোধ নিষ্পত্তিতে নীতিগত সমঝোতায় পৌঁছায়।
কম্পাস প্লাসের ইস্টার্ন জয়েন্ট রিজিওনাল ডিরেক্টরেটের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক সের্গেই এ পুতেনিখিন টাইমসকে বলেন, আইটিসি উল্লেখযোগ্য পুরোনো বকেয়া পরিশোধ এবং নতুন লাইসেন্স চুক্তি সইয়ের লিখিত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার পর লাইসেন্সগুলো পুনর্বহাল করা হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি তাদের দাবি করা পাওনার নির্দিষ্ট অঙ্ক প্রকাশ করেনি।
পুতেনিখিন জানান, জুলাইয়ের সতর্কতার পর আইটিসির কাছ থেকে কোনো যোগাযোগ বা বিরোধ নিষ্পত্তির উদ্যোগ তারা পায়নি। এরপর ২ অক্টোবর চুক্তি বাতিলের নোটিশ দেওয়া হয়।
‘৪ অক্টোবর ২০২৬, রোববার সন্ধ্যায় আইটিসিএলের সঙ্গে আমাদের চুক্তির আওতায় দেওয়া সব লাইসেন্স বাতিল করা হয়’, বলেন তিনি।
তবে পরদিন বুধবার এই সমঝোতা আবারও চাপে পড়ে। কিউ-ক্যাশের বিভ্রাট নিয়ে প্রকাশিত কিছু সংবাদে আইটিসির নামে প্রচারিত বক্তব্যের আপত্তি জানায় কম্পাস প্লাস।
প্রতিষ্ঠানটি ওই বক্তব্যগুলোকে ‘ভুল, মানহানিকর এবং সুনামের জন্য ক্ষতিকর’ বলে দাবি করে এবং আইটিসিকে তা প্রকাশ্যে প্রত্যাহার করে সংশোধনী বিবৃতি দেওয়ার আহ্বান জানায়।
আইটিসির একজন কর্মকর্তা এর আগে দাবি করেছিলেন, মাইগ্রেশন ফি হিসেবে কম্পাস প্লাস ১৫ লাখ ডলার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গ্যারান্টি চেয়েছিল।
কম্পাস প্লাস সতর্ক করে বলেছে, আইটিসি বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে তারা আইনি ব্যবস্থা নিতে পারে। তাতে নীতিগত সমঝোতা ভেস্তে যেতে পারে এবং ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইটিসির লাইসেন্স ব্যবহারের অধিকার আবারও বাতিল হতে পারে। সেই লাইসেন্স আর নবায়নও করা হবে না।
টাইমসের হাতে আসা আরেকটি নথিতে দেখা যায়, বুধবার কিউ-ক্যাশের একটি সদস্য ব্যাংকে পাঠানো কম্পাস প্লাসের আরেকটি নোটিশে একই সতর্কতা পুনর্ব্যক্ত করেছে।
ওই নোটিশে বলা হয়, মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের মধ্যস্থতায় সমঝোতা হলেও লাইসেন্স পুনর্বহাল করা হয়েছে আইটিসির পুরোনো বকেয়া পরিশোধ এবং নতুন লাইসেন্স চুক্তি সইয়ের প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে।
কম্পাস প্লাস সদস্য ব্যাংকটিকে জানায়, আইটিসির সঙ্গে আইনি বিরোধ শুরু হলে নতুন চুক্তি সই সম্ভব নাও হতে পারে এবং এতে আবারও সেবা ব্যাহত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। বাংলাদেশ ব্যাংককে বিষয়টি জানানো হয়েছে বলেও নোটিশে উল্লেখ করা হয়। সেবা অব্যাহত থাকার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাংককে সরাসরি আইটিসির সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে।
আইটিসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সাইফুদ্দিন মুনিরের বক্তব্য জানতে টাইমস যোগাযোগ করলেও তিনি সাড়া দেননি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বুধবার বলেন, কিউ-ক্যাশ অক্টোবরের শেষদিকে সিস্টেম মাইগ্রেশনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল এবং ৪ অক্টোবর সন্ধ্যা থেকে হঠাৎ প্রযুক্তিগত সমস্যার কথা জানিয়েছিল।
তবে তিনি বাণিজ্যিক বিরোধের বিস্তারিত জানাতে অস্বীকৃতি জানান।
তিনি টাইমসকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক আইটিসির কর্মকর্তাদের ডেকে যত দ্রুত সম্ভব, যেকোনো মূল্যে সেবা পুনরুদ্ধারের নির্দেশ দিয়েছে।’
আরিফ হোসেন আরও জানান, পরে সেবা পুনরুদ্ধার করা হয় এবং বুধবার কিউ-ক্যাশের সব সদস্য ব্যাংক স্বাভাবিকভাবে ইলেকট্রনিক লেনদেন চালাচ্ছিল।


