আগামী বছর ব্রিকস জোটের ঘূর্ণায়মান সভাপতির দায়িত্ব নেবে চীন। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং জানিয়েছেন, ব্রিকস সদস্যভুক্ত দেশগুলোর সহযোগিতার তৃতীয় ‘স্বর্ণযুগ’ শুরু করতে ঐকমত্য গড়ে তুলতে এবং সব পক্ষের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত চীন। ২০২৭ সালের ১৯তম ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজক হিসেবে তারা দায়িত্ব পালন করবেন বলেও জানান শি।
শনিবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নিয়ে এ কথা জানান চীনের প্রেসিডেন্ট। প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দেওয়ার সময় শি জিনপিং বলেন, উদ্ভাবন এগিয়ে নেওয়া, শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষা, সভ্যতার পারস্পরিক শিক্ষা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার উন্নয়নে ব্রিকসকে নেতৃত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, এ বছর ব্রিকস সহযোগিতার ২০ বছর পূর্তি হচ্ছে। উদীয়মান বাজার ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর সম্মিলিত উত্থানের প্রেক্ষাপটে এই জোটের যাত্রা শুরু হয়েছিল।জোটের ঘূর্ণায়মান সভাপতিত্বের দায়িত্ব নিয়ে ১৯তম ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করবে বেইজিং। এর আগে ২০১১, ২০১৭ ও ২০২২ সালে চীন ব্রিকস সম্মেলনের আয়োজন করেছিল।
শি জিনপিং বলেন, দুই দশকের যাত্রায় সংহতি ও সহযোগিতাই ব্রিকসের শক্তির প্রধান উৎস হয়ে রয়েছে। এ সময় তিনি সদস্য দেশগুলোকে একে অপরের সঙ্গে আন্তরিক আচরণ, মতপার্থক্যকে সম্মান করে অভিন্ন জায়গা খুঁজে নেওয়া এবং একে অপরের মূল উদ্বেগকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, যোগাযোগ ও সংলাপের মাধ্যমে পারস্পরিক বোঝাপড়া আরও গভীর করতে হবে এবং মতপার্থক্য যথাযথভাবে মোকাবিলা করতে হবে, যাতে ব্রিকস সহযোগিতা স্থিতিশীল ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের পথে এগিয়ে যেতে পারে।
ব্রিকসের যাত্রা শুরু হয়েছিল চার সদস্য নিয়ে। বর্তমানে এটি ১১টি পূর্ণ সদস্য দেশ এবং ১০টি অংশীদার দেশ নিয়ে একটি বৃহৎ জোটে পরিণত হয়েছে। জোটভুক্ত দেশগুলো বিশ্বের প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যার প্রতিনিধিত্ব করে এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যের এক-চতুর্থাংশের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে।

শি জিনপিং বলেন, ব্রিকসের ঐতিহাসিক সম্প্রসারণ এবং বহুমাত্রিক সহযোগিতার কাঠামো বৃহত্তর ব্রিকস সহযোগিতার উচ্চমানের উন্নয়নের নতুন পর্যায় তৈরি করেছে।
একতরফা আধিপত্যবাদ ও শক্তির রাজনীতি বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে দুর্বল করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ পরিস্থিতিতে ব্রিকস দেশগুলোকে ইতিহাসের সঠিক পাশে দৃঢ়ভাবে দাঁড়াতে হবে, আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আরও ন্যায়সংগত ও ভারসাম্যপূর্ণ করার পথে এগিয়ে নিতে হবে এবং মানবজাতির অভিন্ন ভবিষ্যৎ গড়তে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
উদ্ভাবননির্ভর উন্নয়নের বিষয়ে শি জিনপিং ব্রিকস দেশগুলোর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতা সংস্থায় (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন) অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান। চীন জুলাই মাসে এই সংস্থা চালু করেছে। প্রতিষ্ঠানটির সদর দপ্তর সাংহাইয়ে। তিনি নতুন শিল্পায়নে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এগিয়ে নিতে ব্রিকস জোটের দেশগুলোকে উদ্যোগ নেওয়ার প্রস্তাব দেন।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখনো জটিল ও পরিবর্তনশীল উল্লেখ করে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে চীন ব্রিকসের অন্য সদস্য দেশের সঙ্গে যথাযথ ভূমিকা পালন করবে।
সভ্যতার পারস্পরিক শিক্ষার বিষয়ে তিনি ব্রিকস জনগণ-জনগণ বিনিময় ফোরামের মাধ্যমে যোগাযোগ বাড়ানো, শাসন অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং সংস্কৃতি, পর্যটন ও শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর করার আহ্বান জানান। এ ক্ষেত্রে তরুণদের মধ্যে আরও বেশি বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থার বিষয়ে শি জিনপিং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে কেন্দ্র করে বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা সমর্থনের আহ্বান জানান এবং সব ধরনের সুরক্ষাবাদের বিরোধিতা করেন।
তিনি বলেন, সাইবার জগৎ, মহাকাশ ও গভীর সমুদ্রের মতো নতুন ক্ষেত্রগুলোর শাসনব্যবস্থা গঠনে ব্রিকসকে ভূমিকা রাখতে হবে এবং একই সঙ্গে বৈশ্বিক দক্ষিণের কণ্ঠ আরও শক্তিশালী করতে হবে।

ব্রিকস সম্মেলনের এবারের আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, গত ২০ বছরে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্মান জানিয়ে এবং ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে গিয়ে ব্রিকস বৈশ্বিক অঙ্গনে নিজস্ব পরিচয় তৈরি করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার জগৎ, মহাকাশ, জীবপ্রযুক্তি ও গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি শুধু ভবিষ্যতের সুযোগ তৈরি করছে না বরং ভবিষ্যৎ পরিচালনার নিয়মও নির্ধারণ করছে।
মোদি বলেন, ‘বিশ্বের দক্ষিণ অঞ্চলকে শুধু নিয়ম অনুসরণকারী নয়, বরং নিয়ম নির্ধারণকারী শক্তিতে রূপান্তর করতে আমাদের কাজ করতে হবে।’
সম্মেলনে অংশ নেওয়া অন্য নেতারাও গত দুই দশকে ব্রিকসের উন্নয়ন অর্জনের প্রশংসা করেন। ভূরাজনৈতিক সংঘাত বৃদ্ধি এবং একতরফা আধিপত্যবাদের উত্থানের সময়ে বৈশ্বিক দক্ষিণের পক্ষে কথা বলা, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা রক্ষা করা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্রিকস দেশগুলোকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে বলে উল্লেখ করেন তারা।
সেইসঙ্গে নেতারা ব্রিকস ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে চীনের গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রশংসা করেন এবং আগামী বছর চীনের সভাপতিত্বে ১৯তম ব্রিকস সম্মেলন সফলভাবে আয়োজন এবং ব্রিকস সহযোগিতাকে নতুন উচ্চতায় নিতে একসঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সমর্থন জানান।


