ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হুথিদের বিরুদ্ধে ইয়েমেনে নতুন সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। সম্ভাব্য পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ নিরাপদ করার চেষ্টা চালানো, উপকূলীয় অঞ্চলে সৌদি সামরিক বাহিনীর আধিপত্য বিস্তার অথবা হুথি সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় একযোগে হামলা চালানো।
আঞ্চলিক ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের বরাতে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।
এই সামরিক অভিযানের প্রস্তুতির বিষয়ে অবগত ছয়জন ব্যক্তি জানিয়েছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে অভিযান শুরু হতে পারে। স্থল অভিযানে নেতৃত্ব দেবে ইয়েমেনের সৌদি সমর্থিত সরকারের সামরিক বাহিনী। তাদের সহায়তায় বিমান হামলা চালাবে সৌদি আরব।
যুক্তরাষ্ট্র এরইমধ্যে ইয়েমেনে সৌদি অভিযানে গোয়েন্দা সহায়তা দিচ্ছে জানিয়ে তারা বলেন, কিছু আঞ্চলিক ও ইউরোপীয় দেশও সৌদি আরবকে প্রতিরক্ষামূলক সামরিক সহায়তা দিচ্ছে। তবে সৌদি মিত্রদের সরাসরি যুদ্ধে অংশ নেওয়ার সম্ভাবনা নেই।
রয়টার্স এর আগে জানিয়েছিল, সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স মোহাম্মদ বিন সালমান হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি মার্কিন সামরিক সহায়তা, যেমন বিমান হামলার অনুরোধ করলেও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তা নাকচ করে দেন।
এদিকে হুথিবিরোধী অভিযান কবে নাগাদ শুরু হবে সে সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট সময় জানাতে পারেননি সৌদি জোটের কর্মকর্তারা। অবশ্য তাদের অনুমান অনুযায়ী, আগামী সপ্তাহের ভেতরে অথবা নভেম্বরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পরও এই অভিযান শুরু হতে পারে।
সৌদি আরব ২০১৫ সালে আরব জোটের নেতৃত্বে ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতে জড়ায়। তারা দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে সমর্থন দিলে সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে গৃহযুদ্ধ শুরু করে হুথি বিদ্রোহীরা। এর আগে হুথিরা ওই সরকারকে রাজধানী সানা থেকে উৎখাত করেছিল।
২০২২ সালে যুদ্ধরত সব পক্ষ অস্ত্র ও যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথ হামলার মাধ্যমে যুদ্ধ শুরু করলে ফের আঞ্চলিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়ে হুথিরা। তাদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রকে সামরিক সহায়তা করছে সৌদি জোট। ইরান পারস্য উপসাগরে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল সীমিত করে দিলে জ্বালানি রপ্তানি ও জাহাজ চলাচলের জন্য লোহিত সাগরকে বেছে নেয় সৌদি ও মার্কিন মিত্র দেশগুলো। এর জেরে যুদ্ধে প্রভাব বিস্তার করতে সৌদি সংশ্লিষ্ট জাহাজ ও সমুদ্র উপকূলের কাছাকাছি থাকা তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা শুরু করে হুথি বিদ্রোহীরা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্ভাব্য সৌদি অভিযানের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হবে লোহিত সাগরে হুথিদের অগ্রগতি ঠেকানো। সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে বিদ্রোহী গোষ্ঠীটি উপকূল ধরে এগিয়ে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেয়। প্রণালিটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তের প্রবেশ ও বহির্গমন পথ। এটি ভূমধ্যসাগর ও এশিয়ার মধ্যে যোগাযোগ স্থাপনকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ।
অভিযান সংশ্লিষ্ট আঞ্চলিক ও ইয়েমেনি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সৌদি আরব হামলার জন্য দুটি সম্ভাব্য বিকল্প বিবেচনা করছে। একটি হলো, বাব এল-মান্দেবের আশপাশে সীমিত ও লক্ষ্যভিত্তিক হামলা। অন্যটি আরও বড় পরিসরের অভিযান, যেখানে ইয়েমেনের আল-বাইদা, মারিব, তাইজ ও আল-জওফ প্রদেশে একযোগে সমন্বিত হামলা চালানো হবে।
কর্মকর্তারা জানান, অভিযানের পরিসরের ওপর নির্ভর করে এক লাখের বেশি ইয়েমেনি সেনা মোতায়েন করা হতে পারে।
পশ্চিমা কূটনীতিক ও এক উপসাগরীয় কর্মকর্তা বলেন, রিয়াদের ধারণা হুথিরা বাব এল-মান্দেবের নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় তাদের সঙ্গে নতুন শান্তি আলোচনায় যাওয়া সম্ভব নয়। ওই প্রণালি নিয়ন্ত্রণে থাকায় হুথিদের হাতে দরকষাকষির জন্য যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে।
সৌদি আরবে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইকেল র্যাটনি বলেন, অভিযানটি সীমিত পরিসরের হবে এবং ২০১৫ সালের সৌদি নেতৃত্বাধীন অভিযানের তুলনায় অনেক ছোট হবে। তিনি বলেন, হুথিদের পুরোপুরি পরাজিত করার ইচ্ছা থাকলেও সৌদি আরবের প্রথম প্রয়োজন বাব আল-মান্দেবের আশপাশের পরিস্থিতি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া। সবচেয়ে ভালো পরিস্থিতি হবে সীমিত অভিযান চালিয়ে উপকূলীয় এলাকা পুনর্দখল করা এবং স্বাভাবিক নৌ চলাচল ফিরিয়ে আনা।
গত তিন বছরে লেবাননে ইরান সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি হামলায় দুর্বল হয়ে পড়ার পর ইয়েমেনের হুথিরাই এখন মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সবচেয়ে শক্তিশালী মিত্রে পরিণত হয়েছে।
কাজেই বিশ্লেষকরা বলছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি-নির্দেশিত নতুন অভিযান শুরু হলে তা যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে নতুন সংঘাতের কেন্দ্র তৈরি করবে।
গত মাসে সৌদি আরব তুরস্ক ও পাকিস্তানের সঙ্গে যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি (মক্কা চুক্তি) সই করেছে। পাকিস্তানি ও আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তুরস্ক ও পাকিস্তান সৌদি আরবকে এমন সামরিক সরঞ্জাম দিয়েছে, যা ইয়েমেনে ব্যবহার করা হচ্ছে।
এক পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তা জানান, গত মাসে পাকিস্তান চারটি কার্গো উড়োজাহাজে করে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, হালকা কামান, ড্রোন ও ড্রোন-বিরোধী ব্যবস্থা ইয়েমেনের এডেনে পাঠিয়েছে। এডেন সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনি সরকারের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। পাকিস্তানি সামরিক উপদেষ্টারাও সৌদি কর্মকর্তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে অবস্থান করছেন এবং ইয়েমেনি বাহিনীকে সহায়তা করছেন বলে নিশ্চিত করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তারা জানান, যুদ্ধ শুরুর আগেই সৌদি আরব যে তুর্কি ড্রোন কিনেছিল, সেগুলোও ইয়েমেনের আকাশে মোতায়েন করা হয়েছে।
নতুন অভিযান শুরুর ক্ষেত্রে সৌদি আরবের অন্যতম বড় উদ্বেগ হলো হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে তেল স্থাপনা এবং অন্য অবকাঠামো রক্ষা করা। আঞ্চলিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ জন্য রিয়াদ কয়েকটি মিত্র দেশের কাছে প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা চেয়েছে।
আরেক পাকিস্তানি কর্মকর্তা জানান, সৌদি আরবের স্থলসীমান্ত রক্ষা এবং ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকাতে পাকিস্তান ৩০ হাজার থেকে ৪০ হাজার সেনা সৌদি আরবে মোতায়েন করেছে। গত বছর থেকে বিভিন্ন ধাপে এসব সেনা সেখানে পৌঁছেছে এবং সাম্প্রতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পরও নতুন করে সেনা পাঠানো হয়েছে। তবে ইয়েমেনে সরাসরি যুদ্ধের জন্য সেনা পাঠানোর কোনো সিদ্ধান্ত ইসলামাবাদ নেয়নি বলে নিশ্চিত করেন ওই কর্মকর্তা জানান।
সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় বন্দরনগরী ইয়ানবু রক্ষায় প্রতিরক্ষামূলক ব্যবস্থা ও সেনা পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ইউরোপীয় মিত্র ফ্রান্স।


