স্মার্ট এনআইডি বিতরণে ‘শম্বুকগতি’

স্মার্ট এনআইডি বিতরণে ‘শম্বুকগতি’
স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র। ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

প্রায় দেড় দশক আগে দেশের নাগরিকদের স্মার্ট জাতীয় পরিচয়পত্র দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)।  তবে এখনো সব যোগ্য ভোটারদের হাতে স্মার্ট এনআইডি তুলে দিতে পারেনি সংস্থাটি।

ইসি ও প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ২০১১ সালে নেওয়া ওই প্রকল্পের আওতায় এখন পর্যন্ত ১২ কোটি ৬৩ লাখ ভোটারের মধ্যে মাত্র প্রায় ৬ কোটি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি দেওয়া সম্ভব হয়েছে।

এমন বাস্তবতায় কমিশন প্রকল্পটির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। অর্থাৎ, আগামী নভেম্বরে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও প্রকল্পটি শেষ করা যাচ্ছে না। আর মেয়াদ বাড়ালে স্বাভাবিকভাবেই বাড়বে ব্যয়ও।

১৪ বছর আগে দেশের নয় কোটি ভোটারকে স্মার্ট এনআইডি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে তাতে সরকারকে সহায়তা করতে সম্মত হয় বিশ্বব্যাংক ও ইউএনডিপি। তখনই যাত্রা শুরু করে ‘আইডেনটিফিকেশন সিস্টেম ফর এনহ্যান্সিং অ্যাকসেস টু সার্ভিস; সংক্ষেপে আইডিইএ প্রকল্প।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, চলার পথে চুক্তি বাতিল, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ ও একাধিকবার মেয়াদ বাড়নোসহ নানা কারণে প্রকল্পটিতে ধীরগতি দেখা দেয়। ২০১৫ সালে ফরাসি প্রতিষ্ঠান অবার্থুর টেকনোলজিসের সঙ্গে ৮০০ কোটি টাকার চুক্তি হলে তারা কাজ শেষ করতে ব্যর্থ হয়।

কারণ ২০১৭ সালে ইসি অপেশাদারত্বের অভিযোগ তুলে ওই চুক্তি বাতিল করে। এরপর বিশ্বব্যাংকও অর্থায়ন বন্ধ করে দেয়। পরে সরকারই নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি চালাতে শুরু করে।

আইডিইএ প্রকল্পের মেয়াদ অন্তত চারবার বাড়ানো হয়েছে। ১ হাজার ৩৭৯ কোটি টাকায় শুরু হওয়া প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ায় এর ব্যয় গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬৯৬ কোটিতে। পরে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে ইসি নতুন আরেকটি প্রকল্প নেয়, যার নাম ‘আইডিইএ দ্বিতীয় পর্যায়’। যেখানে তিন কোটি ভোটারকে স্মার্ট কার্ড দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়।

নতুন এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮০৫ কোটি টাকা এবং মেয়াদ ২০২৫ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।

সে হিসেবে প্রকল্পের হাতে আছে আর মাত্র আড়াই মাস। কিন্তু স্মার্ট কার্ড বিতরণে আশানুরূপ অগ্রগতি হয়নি।

সেনাবাহিনী পরিচালিত বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি (বিএমটিএফ) ৪০৬ দশমিক ৫ কোটি টাকায় ৩ কোটি স্মার্ট কার্ড তৈরি করে দেওয়ার প্রস্তাব করেছিল। সেসময় প্রতিটি কার্ডের দাম ধরা হয়েছিল ১৩৫ টাকা ৫০ পয়সা করে। কিন্তু ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ায় পরে বিএমটিএফ প্রতিটি কার্ডের দাম ১৭২ টাকা চায়। তখন কার্ডের সংখ্যা কমিয়ে তিন কোটি থেকে দুই কোটি ৩৬ লাখ করা হয়।

আরও পড়ুন

কার্যক্রমের সার্বিক অগ্রগতি নিয়ে জানতে চাইলে প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আজিজুর রহমান সিদ্দিকী বলেন, ‘এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন সচিবের সঙ্গে কথা বললে ভালো হয়। উনি সবকিছুর বিষয়ে অবগত।’

তবে তিনি এটাও জানান যে, বর্তমানে তাদের হাতে প্রায় দেড় লাখ স্মার্ট কার্ড রয়েছে। আগামী অক্টোবরে ফ্রান্স থেকে কার্ড আসতে শুরু করবে। সেখান থেকে ২ কোটি ৩৬ লাখের বেশি কার্ড আসবে।

বিষয়টি নিয়েটাইমস  কথা বলেছে ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এএসএম হুমায়ুন কবীরের সঙ্গে।

তিনি বলেন, ‘আমরা বিতরণ কার্যক্রম আরও সম্প্রসারণের প্রস্তুতি নিচ্ছি। আগামী মাস থেকে ধাপে ধাপে অতিরিক্ত তিন কোটি ভোটারকে আওতায় আনা হবে। উপজেলা পর্যায়ে প্রিন্টিং ও বিতরণ করা হবে। আগামী মাসে প্রায় আড়াই কোটি নতুন কার্ড পাওয়া যেতে পারে।’

প্রতিবছর চার থেকে পাঁচ কোটি কার্ড বিতরণের পরিকল্পনা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘তবে এটি বাজেট বরাদ্দ ও কমিশনের সামগ্রিক সক্ষমতার ওপর নির্ভর করবে।’

বাংলাদেশে স্মার্ট কার্ড তৈরি হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তাই আমাদের আমদানি করতে হয়, আর এতে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়। দেশে উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকলে কাজটি অনেক সহজ হতো।’

নিরাপদ, সঠিক ও নির্ভরযোগ্য জাতীয় পরিচয় ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং এর মাধ্যমে উন্নত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যেই স্মার্ট কার্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল সরকার। স্মার্ট কার্ডে একটি চিপ থাকে, যেখানে ৩২ ধরনের তথ্য মেশিনে পড়ার মতো করে সংরক্ষিত থাকে। সাধারণ এনআইডিতে এ সুবিধা নেই।

প্রকল্প শুরুতে ইসি জানিয়েছিল, স্মার্ট কার্ডে পেশা, ঠিকানা, বয়স, বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ধর্ম, পাসপোর্ট ও ড্রাইভিং লাইসেন্স নম্বর, টিআইএন নম্বর, ফোন নম্বর, বাবা-মা ও স্বামী/স্ত্রীর তথ্য থাকবে।

এছাড়া কারো কোনো ধরনের অক্ষমতা ও মৃত্যু হলে সে তথ্যও সংরক্ষিত হবে। ডিজাইনে থাকবে জাতীয় ফুল শাপলা, জাতীয় পাখি দোয়েল, জাতীয় স্মৃতিসৌধ, চা পাতা, মুক্তিযুদ্ধকালীন ও বর্তমান পতাকা, জাতীয় সঙ্গীতের অংশবিশেষ।

স্মার্ট এনআইডি এমনভাবে তৈরি করা হবে যার তথ্য জাল করা সম্ভব নয়, যা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

বিদেশ ভ্রমণের ধুম

প্রকল্পে সাফল্য না এলেও গত দুই বছর ধরে ইসির কর্মকর্তাদের বিদেশ সফর চলছেই। এ সময়ের মধ্যে তারা প্রকল্পের নামে ১৮০ বার বিদেশ ভ্রমণ করেছেন।

দুই নির্বাচন কমিশনারসহ ইসি ও প্রকল্পের ৪৮ কর্মকর্তা সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, মালদ্বীপ, দক্ষিণ আফ্রিকা, জর্ডান ও মালয়েশিয়া সফরে যাবেন প্রকল্পের অর্থে।

নির্বাচন কমিশনার সাবেক সেনা কর্মকর্তা আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ এবং আইডিইএ প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার আজিজুর রহমান সিদ্দিকী ফ্রান্সে যাচ্ছেন কেবল স্মার্ট কার্ডের মান যাচাই করতে।

ইসির একটি অফিস আদেশ অনুযায়ী, কমিশনার সানাউল্লাহ ও সিদ্দিকী ২৮ সেপ্টেম্বর ফ্রান্সে রওনা দেবেন। সানাউল্লাহ ৪ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্রান্সে অবস্থান করবেন। সানাউল্লাহ সেখানে ব্ল্যাঙ্ক স্মার্ট কার্ডের প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেকশন (পিএসআই) কার্যক্রম তদারকি করবেন। একই সঙ্গে প্রবাসী ভোটার নিবন্ধন ও ওভারসিজ ভোট (ওসিভি) বিষয়ে ফ্রান্সে বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকও করবেন তিনি।

সিদ্দিকীর ফ্রান্স সফরের খরচ বহন করবে বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি। তিনি ১১ অক্টোবর দেশে ফিরবেন। তবে ফ্রান্সে অতিরিক্ত অবস্থান এবং সুইজারল্যান্ড ও জার্মানি ভ্রমণের খরচ তিনি নিজেই বহন করবেন।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর