দুই–তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র এক মাসের মাথায় এক জটিল সাংগঠনিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে বিএনপি। সরকার পরিচালনা ও দলীয় কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়হীনতায় দল ও সরকার বর্তমানে এক হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষ করে দলের শীর্ষ নেতাদের বড় অংশ মন্ত্রিসভায় দায়িত্ব নেওয়ায় সাংগঠনিক নেতৃত্বে এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে তৃণমূল পর্যায়ে যে শক্তিশালী প্রস্তুতি প্রয়োজন, সেখানে বড় ধরনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে।
দীর্ঘদিন রাজপথে আন্দোলন–সংগ্রামের পর বিএনপি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করেছে। তবে নতুন এই বাস্তবতায় সরকারের প্রশাসনিক কাজ ও দল পুনর্গঠনে কিছুটা সময় লাগছে। অনেক সিনিয়র ও প্রভাবশালী নেতা এখন রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যস্ত থাকায় দলের সাংগঠনিক কার্যক্রমে একটি দৃশ্যমান দূরত্ব তৈরি হয়েছে। এই স্থবিরতা দিন দিন আরও স্পষ্ট হচ্ছে, যার প্রভাব পড়ছে দলের সার্বিক শক্তিতে।
দলের অনেক নেতা মনে করছেন, সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন। এর আগেই অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলোর সমাধান না হলে বিএনপিকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
দলের সিনিয়র নেতাদের মতে, দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকায় এবং অসংখ্য মামলার চাপে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি আগে থেকেই কিছুটা দুর্বল ছিল। বর্তমানে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব রাষ্ট্র পরিচালনায় বেশি মনোযোগী হওয়ায় মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও তা বাস্তবায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান তৈরি হয়েছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অনেক জায়গায় এখনো পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি। আবার কোথাও কোথাও মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি দিয়েই কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। ফলে সঠিক নির্দেশনার অভাবে তৃণমূলের নেতা–কর্মীরা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না।
মাঠপর্যায়ের মধ্যম সারির নেতারাও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, ক্ষমতায় থাকায় দল গোছানোর কাজ আরও গতিশীল হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার ধীরগতি ও অভ্যন্তরীণ বিভাজন দলের শক্তি কমিয়ে দিচ্ছে। দীর্ঘদিন কমিটি ছাড়া দল চালানোয় সংগঠনের গতিশীলতা কমে গেছে। এতে ভবিষ্যতে দল আরও দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এদিকে তৃণমূল পর্যায়ে আরেকটি বড় বাধা হলো এখনো ঝুলে থাকা মামলার চাপ। বিএনপি এখন ক্ষমতায় থাকলেও মাঠপর্যায়ের অনেক সক্রিয় কর্মীর নামে থাকা মামলাগুলো নিষ্পত্তি হয়নি। এই আইনি জটিলতার কারণে অনেক যোগ্য নেতা এখনো রাজনীতিতে পূর্ণ উদ্যমে ফিরতে পারছেন না। এটি দলীয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে।
দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের পর বিদ্রোহী ও পরাজিত প্রার্থীদের অনুসারীদের মধ্যে বিরোধ প্রকট হয়েছে। অনেক এলাকায় নতুন ক্ষমতার কেন্দ্র তৈরি হওয়ায় সাধারণ নেতা–কর্মীরা বিভ্রান্ত হচ্ছেন। এই সুযোগে শক্তিশালী অন্য দলগুলো মাঠপর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে নিতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাদের মতে, দ্রুত এই কোন্দল নিরসন করা না হলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিএনপিকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে।
দলের বর্তমান অবস্থা নিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দলের কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। তবে বর্তমানে তা ছোট পরিসরে চলছে।
তিনি জানান, একটি নতুন সরকার গুছিয়ে নিতে স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা সময় লাগে। দলের অনেক অভিজ্ঞ সদস্য এখন রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করছেন, ফলে সেই শূন্যস্থানগুলো পূরণ করতে সময় লাগছে। তবে সরকার ও দল নিজ নিজ স্বতন্ত্র কাঠামোয় কাজ করবে—এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলে তিনি মন্তব্য করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই সংকট থেকে উত্তরণে দ্রুত তৃণমূল পর্যন্ত নতুন ও যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটানো এবং নিয়মিত কর্মসূচির মাধ্যমে স্থানীয় ইস্যুগুলোতে সাধারণ মানুষের সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারলে বিএনপি এই সাময়িক স্থবিরতা কাটিয়ে আবারও সুসংগঠিত শক্তিতে পরিণত হতে পারবে।
তবে দল গোছানোর বিষয়ে আশাবাদী বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টামণ্ডলীর এক সদস্য জানান, শিগগিরই দলের সাংগঠনিক পরিস্থিতি ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ঈদুল ফিতরের পরপরই বিএনপির হাইকমান্ড এই বিষয়ে বিশেষ বৈঠকে বসবে। সেখানে দলকে নতুন করে শক্তিশালী করার চূড়ান্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।


