বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার জেরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তিন কর্মকর্তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাটির ভেতরে নতুন করে অস্বস্তি ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কারণ দর্শানোর নোটিশে ১০ দিনের সময় দেওয়ার পরও মাত্র এক দিনের মাথায় নেওয়া এই পদক্ষেপকে অনেক কর্মকর্তা ভিন্নমত দমনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। বিশেষ করে যখন অতীতের বড় ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে ‘সহায়তাকারী’ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা এখনো চোখে পড়েনি।
মঙ্গলবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি এ কে এম মাসুম বিল্লাহকে রংপুর অফিসে, সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা শ্রাবণকে বগুড়া অফিসে এবং নীল দলের সাধারণ সম্পাদক ও এসএমই অ্যান্ড স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফাকে প্রধান কার্যালয় থেকে বরিশাল অফিসে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘তিন কর্মকর্তাকেই তাৎক্ষণিক বদলীকৃত কর্মস্থলে যোগদানের জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের স্ট্যান্ড রিলিজ করে নতুন কর্মস্থলে যোগ দিতে বলা হয়েছে।’
দাপ্তরিক আদেশে বদলিকে ‘অবিলম্বে কার্যকর’ হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্দেশনা অনুযায়ী বুধবারের মধ্যেই তাদের নতুন কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের সূত্রগুলো বলছে, কর্মকর্তাদের সংগঠনের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সাধারণত মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শাখা পর্যায়ে বদলি করা হয় না এবং এ ক্ষেত্রে তারা একটি অনানুষ্ঠানিক সুরক্ষা পেয়ে থাকেন। সেই প্রথা ভেঙেই এবার এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এর আগে ১৬ ফেব্রুয়ারি হঠাৎ ডাকা এক সংবাদ সম্মেলনে কাউন্সিলের এই তিন নেতা গভর্নরের একাধিক পদক্ষেপ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন তোলেন।
দুর্বল ব্যাংক একীভূতকরণ প্রক্রিয়া, একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ এবং গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে তারা আপত্তি জানান।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নরের আচরণকে ‘স্বৈরাচারী’ বলেও মন্তব্য করা হয়।
স্ট্যান্ড রিলিজের ঘটনার দিন মঙ্গলবার দুপুরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ‘শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়েছে। তারা উত্তর দিলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করা হবে।’
তবে এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাদের ঢাকার বাইরে স্ট্যান্ড রিলিজের আদেশ জারি হয়, যা নিয়ে নতুন প্রশ্ন উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হচ্ছে, স্টাফ রেগুলেশন অনুযায়ী অনুমোদন ছাড়া কোনো কর্মকর্তা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে পারেন না। এই বিধি লঙ্ঘনের অভিযোগেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
তবে বদলির পর মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেওয়া এক ফেসবুক পোস্টে কাউন্সিলের সভাপতি মাসুম বিল্লাহ পাল্টা অভিযোগ তোলেন।
তিনি দাবি করেন, সংশোধিত বাংলাদেশ ব্যাংক অর্ডার অর্থ মন্ত্রণালয়ে নাকচ হওয়ার পর গভর্নর নিজেই কাউন্সিলকে ডেকে অর্থ উপদেষ্টার বিরুদ্ধে সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে অনুরোধ করেছিলেন। তার ভাষায়, গভর্নরের নির্দেশনা অনুযায়ী তখন তারা কর্মসূচি করলেও কোনো শোকজ করা হয়নি।
মাসুম বিল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, গভর্নরের আচরণের সমালোচনা করলেই যদি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হয়, তবে এটি কি নব্য ‘স্বৈরাচারী’ আচরণ নয়।
টাইমসকে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সিনিয়র ও এক্সিকিউটিভ ম্যানেজমেন্ট টিম থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত সমন্বয় বৈঠক হচ্ছে না এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনেক ক্ষেত্রে সীমিত পরিসরে নেওয়া হচ্ছে।’
ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যুতে মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর এক দিনের নোটিশে বোর্ড সভা ডাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করে এবং সদস্যদের মতামতের ভিত্তিতেই তারা জরুরি সংবাদ সম্মেলন করেন। একই পোস্টে গভর্নরের জন্য ২ দশমিক শূন্য ৮ কোটি টাকায় টয়োটা আলফার্ড কেনা এবং ওষুধ বিল সংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগসহ একাধিক প্রশ্নও তোলেন তিনি। এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
এদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে আরেকটি প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ বলছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ব্যাংক লুটে সহায়তার অভিযোগে যেসব কর্মকর্তার নাম সামনে এসেছে, তাদের বিরুদ্ধে বর্তমান গভর্নরের আমলে দৃশ্যমান কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যায়নি। এ নিয়ে সংবাদ সম্মেলনগুলোতে একাধিকবার প্রশ্ন করা হলে গভর্নর বলেছেন, তিনি কর্মকর্তাদের অতীত নয়, বর্তমান কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নিতে চান।
কিন্তু নিজের সিদ্ধান্তের সমালোচনা আসতেই দ্রুত স্ট্যান্ড রিলিজের ঘটনায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভেতরে নীতি নিরপেক্ষতা ও বার্তার সামঞ্জস্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক অফিসার্স ওয়েলফেয়ার কাউন্সিল বুধবার সকাল ১১টায় প্রতিবাদ সভা ডেকেছে বলে জানা গেছে, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলতে পারে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে গভর্নর আহসান এইচ মনসুরকে ফোন করা ও মেসেজ পাঠানো হলেও এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত উত্তর দেননি।


