বিশ্বভ্রমণের আশা ফুরাল বাঁকখালীতে/ সন্তানকে শ্মশানে রেখে নিউজিল্যান্ড ফিরছেন বাবা-মা

সন্তানকে শ্মশানে রেখে নিউজিল্যান্ড ফিরছেন বাবা-মা
ছবি: টাইমস
Advertisement
Advertisement

বাঁকখালী নদীর মোহনায় বিধ্বস্ত হয়েছে বিলাসবহুল নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। কক্সবাজারের একটি শ্মশানে সম্পন্ন হয়েছে কিশোর আলবার্টের শেষকৃত্য। সব হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে স্বদেশে ফিরছেন তার পরিবারের বেঁচে থাকা তিন সদস্য।

সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে নিউজিল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে এসেছিলেন জন এডওয়ার্ড ও তার পরিবার। ওই স্বপ্ন বাস্তবায়নে কক্সবাজারের উপকূলে কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি করেছিলেন জোড়া নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’। পরিকল্পনা ছিল, এই নৌযানে চড়ে বিশ্বভ্রমণ শেষে নিজ দেশে ফিরবেন তারা। তবে সেই স্বপ্নের পরিণতি ঘটেছে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডিতে। সাগরে নৌযান ডুবে প্রাণ হারিয়েছে পরিবারের ১৬ বছর বয়সি কিশোর আলবার্ট।

বিধ্বস্ত নৌযানটি পড়ে আছে বাঁকখালী নদীতে। নদীর কাছের শ্মশানে শেষকৃত্য সম্পন্ন হওয়া আলবার্টের স্মৃতি বুকে নিয়ে স্বদেশে ফিরছেন তার বাবা জন এডওয়ার্ড, মা বেলা (৩৬) ও ভাই রালফ (১৩)। শুক্রবার মধ্যরাতে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে তাদের রওনা হওয়ার কথা রয়েছে। গত ২৫ আগস্ট কক্সবাজার শহরের বাঁকখালী নদীর মোহনা-সংলগ্ন নাজিরারটেক সাগরে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ডুবে যাওয়ার পর থেকে তারা কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে ছিলেন।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও বিপুল অর্থ ব্যয়ের নৌযানটি এখন তাদের কাছে এক বিধ্বস্ত অধ্যায়ের প্রতীক। কিশোর আলবার্টের শেষ স্মৃতি রয়ে গেছে কক্সবাজারের মাটিতে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাহমুদুর রহমান বলেছেন, ‘পরিবারের তিন সদস্যের দেশে ফেরার প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। শুক্রবার মধ্যরাতে তারা নিউজিল্যান্ডের উদ্দেশে রওনা হবেন।’

তিনি জানান, নৌকাডুবির সময় পরিবারের সদস্যদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় নথি হারিয়ে যায়। এতে দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে জটিলতা তৈরি হয়। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস না থাকায় শ্রীলঙ্কায় অবস্থিত দূতাবাসের সঙ্গে অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। নৌকাডুবির পর থেকে পরিবারের তিন সদস্য বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে অবস্থান করছিলেন। নিরাপত্তায় সেখানে পুলিশ মোতায়েন ছিল।

বিশ্বভ্রমণের স্বপ্নে ‘আইল্যান্ড গার্ল’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড ২০২৪ সালে পরিবারের চার সদস্যকে নিয়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। উদ্দেশ্য ছিল নিজস্ব নৌযানে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণ। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে তারা কক্সবাজার উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করেন এবং শহরের এসএম পাড়া উপকূলে নির্মাণ করেন ‘আইল্যান্ড গার্ল’।

দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে তৈরি হয়েছিল এই ভাসমান আবাসন। আধুনিক নকশার নৌযানটিতে ছিল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘর। নির্মাণে খরচ হয়েছিল এক কোটি টাকার বেশি। স্থানীয় বিএনপি নেতা দিদারুল ইসলাম রুবেল জানিয়েছেন, ‘ব্যক্তিগত অ্যাডভেঞ্চার ও সমুদ্র ভ্রমণের কথা মাথায় রেখে এটি তৈরি করা হয়েছিল। নির্মাণকাজ শেষ করতে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে।’

আরও পড়ুন

দীর্ঘদিন ধরে নৌযানটি বাঁকখালী নদীর নুনিয়াছড়া জেটির বিপরীত পাশে নোঙর করা ছিল। এখানেই বসবাস করছিলেন পরিবারের সদস্যরা। গত ২৫ আগস্ট সাগরের উত্তাল ঢেউয়ে নৌযানটি ডুবে গেলে বিশ্বভ্রমণের পরিকল্পনা ভেঙে পড়ে।

স্থানীয় জেলে আবদুর রহমান বলেছেন, ‘বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে নৌযানটির একটি অংশ দ্রুত ডুবে যায়। কয়েক মিনিটের মধ্যে অন্য অংশটিও তলিয়ে যায়।’

নৌকাডুবির ঘটনায় তিনজনকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হলেও নিখোঁজ ছিল কিশোর আলবার্ট। পরের দিন তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

ছবি: টাইমস

নদীর তীরে শেষকৃত্য, স্বদেশে ফিরছেন স্বজনেরা

নিহত আলবার্টের মরদেহ উদ্ধারের পর আইনি প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। পরে পুলিশের উপস্থিতিতে বাঁকখালী নদীর তীরের শ্মশানে তার শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী বলেছেন, ‘মরদেহ উদ্ধারের পর আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করা হয়। পরে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস ও পরিবারের অনুমতি নিয়ে পুলিশের উপস্থিতিতে বাঁকখালী নদীর তীরের শ্মশানে আলবার্টের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।’

পরিবারের তিন সদস্য দেশে ফিরলেও আলবার্টের দেহাবশেষ থেকে যাচ্ছে কক্সবাজারের মাটিতে। স্বপ্নের নৌযানটিও পড়ে আছে বাঁকখালী নদীতে।

এর আগেও ডাকাতের কবলে পড়েছিল পরিবারটি

নৌকাডুবির কয়েক মাস আগে, চলতি বছরের ৮ এপ্রিল রাতে কক্সবাজারের মহেশখালীর সোনাদিয়া চরে ডাকাতের কবলে পড়েছিল পরিবারটি। পরদিন ৯ এপ্রিল কোস্টগার্ডের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তা জানানো হয়।

কোস্টগার্ডের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজনের পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছিল, জন এডওয়ার্ড পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের উদ্দেশ্যে বাংলাদেশে এসেছিলেন। পরিকল্পনা ও নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় কর্তৃপক্ষ তাদের সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করে। ১ মার্চ প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা নির্দেশনা দেওয়া হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, পাসপোর্ট পর্যালোচনায় দেখা যায় তাদের মেয়াদ শেষ হয়েছে ১৬ জানুয়ারি ২০২৬। তবে কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা উপেক্ষা করে তারা সোনাদিয়া চরে অবস্থান করছিলেন। ৮ এপ্রিল রাতে দুষ্কৃতকারীদের হামলার খবর পেয়ে কোস্টগার্ডের দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে তাদের উদ্ধার করে।

এরপরও সমুদ্রভ্রমণের স্বপ্ন থেমে থাকেননি তারা। তবে ২৫ আগস্টের নৌকাডুবি সব বদলে দেয়। পেছনে পড়ে রইল কক্সবাজারের বাঁকখালী নদীতে ডুবে থাকা ‘আইল্যান্ড গার্ল’ এবং শ্মশানে চিরনিদ্রায় শায়িত কিশোর আলবার্ট।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad