শৌচাগার সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নারীরা

শৌচাগার সংকটে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে নারীরা
প্রতীকী ছবি: সংগৃহীত
Advertisement
Advertisement

শুধু তৃষ্ণা মেটানো নয়- স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্যও অপরিহার্য পানি, বিশেষ করে নারীদের জন্য। মাসিক, গর্ভাবস্থা ও মাতৃদুগ্ধ দানকালে পর্যাপ্ত পানি পান করা আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যথেষ্ট পানি পান নারীর ঋতুস্রাবের সময়ের ব্যথা কমায়, মূত্রনালীর সংক্রমণের ঝুঁকি কমায় এবং হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। যদি প্রয়োজনের তুলনায় কম পানি পান করা হয়, তাহলে ক্লান্তি, মাথাব্যথা থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি পর্যন্ত দেখা দিতে পারে।

কিন্তু পুরো বাংলাদেশে অসংখ্য নারী ঘরের বাইরে বেরোলে ইচ্ছাকৃত কম পান করেন পানি। তারণ তাদের কাছে টয়লেট বা শৌচাগার খুঁজে বের করার ভয়ের তুলনায় তৃষ্ণা সহ্য করা সহজ। তাই এক গ্লাস পানিতে কয়েক চুমুক মানেই কয়েক ঘণ্টার অস্বস্তি। আদালত, বাজার, টার্মিনাল বা অফিসে নারীদের জন্য টয়লেট ব্যবহারের মৌলিক চাহিদাই হয়ে উঠছে প্রতিদিনের লড়াই।

সকাল আটটার মধ্যেই পুরান ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত প্রাঙ্গণ ভিড়ে ঠাসা। তার মধ্যেই আইনজীবী নাজনীন সুলতানা তার এক নারী মক্কেলকে সাথে নিয়ে খুঁজছেন ব্যবহারযোগ্য টয়লেট। অবশেষে একটি পেলেন, তবে দরজা বন্ধ। আরেকটিতে লেখা, ‘স্টাফ অনলি’ (কর্মীদের জন্য)। পুরোটা সময় ওই নারী দাঁড়িয়ে থাকেন উদ্বেগ, লজ্জা আর ব্যথায় কুঁকড়ে।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বলা যায় দেশব্যাপী এক কাঠামোগত ব্যর্থতা। দেশের মাত্র ২৪ শতাংশ আদালতে নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট আছে, এর মধ্যে কার্যকর মাত্র ১২ শতাংশ। অর্থাৎ বিচার চাইতে আদালতে আসা প্রায় ৮৮ শতাংশ নারী মৌলিক স্যানিটেশন সুবিধা থেকে বঞ্চিত।

বিভাগীয় শহরের অনেক আদালতে তো নারীদের টয়লেটের অস্তিত্বই নেই। লক্ষ্মীপুর, সুনামগঞ্জ, রাজবাড়ীর আদালতে নেই কোনো আলাদা টয়লেট। বিস্ময়ের বিষয়, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের মতো বিশেষ আদালতের প্রায় ৮০ শতাংশে এই ধরনের সুবিধা নেই। এতে করে বিচারপ্রক্রিয়ায় আসা নারীদের অভিজ্ঞতা আরও ভীতিকর হয়ে ওঠে।

২০২৪ সালে দেশের ৬৪ জেলায় ব্র্যাকের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, প্রতিদিন গড়ে ১৪০ জন নারী ও শিশু আসেন আদালতে। কিন্তু মাত্র ১০ শতাংশ আদালতে নারী-বান্ধব স্যানিটেশন সুবিধা আছে। শুক্র ও শনিবার আদালতের টয়লেটগুলো বন্ধ থাকায় ভোগান্তি আরও বাড়ে।

ইউরোপীয় সিইপিইজে মানদণ্ড অনুযায়ী, নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট ছাড়া আদালতকে ‘অপ্রবেশ্য’ বিবেচনা করা হয়। বাংলাদেশের বিচারিক অবকাঠামো এই ন্যূনতম মান থেকেও বহু দূরে।

আরও পড়ুন

সমস্যা শুধু আদালতে নয়, ঢাকার রাস্তাঘাট, বাজার, কর্মস্থল, সবই যেন নারীর প্রয়োজনকে অদৃশ্য করে রেখেছে।

আগস্টে প্রকাশিত ওয়াটারএইডের ‘উইমেন অন দ্য মুভ: হাউ পুওর স্যানিটেশন ফোর্সেস আরবান উইমেন টু রিডিউস ওয়াটার ইনটেকে’ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে নারীদের বাস্তবতার নির্মম চিত্র। প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজধানীর ৩৫ শতাংশ নারী বাড়ির বাইরে টয়লেট ব্যবহার পারতপক্ষে করেন না, কারণ সেগুলো অনিরাপদ, অপরিচ্ছন্ন বা ব্যবহার অনুপযোগী।

যারা বাইরে টয়লেট ব্যবহার করতে চান না, তাদের ৭৪ শতাংশ জানান, নোংরা, ভিড়ে ভরা, অনিরাপদ বা অস্বাস্থ্যকর টয়লেট ব্যবহার না করতে তারা ইচ্ছাকৃত পানি কম পান করেন। এর ফলে নানা স্বাস্থ্যজটিলতা দেখা দেয়। ৫৯ শতাংশ নারী জানান তাদের প্রস্রাব হলদে হয়ে যায়, আর ৪৮ দশমিক ১ শতাংশ ক্লান্তি ও দুর্বলতায় ভোগেন। সঙ্গে শুকনো ত্বক, ফাটা ঠোঁট তো আছেই। আরও উদ্বেগজনক হলো, ৪১ শতাংশ অলিগুরিয়া, ৩০ দশমিক ৮ শতাংশ কোষ্ঠকাঠিন্য এবং ২২ শতাংশ বারবার মূত্রনালীর সংক্রমণে (ইউটিআই) আক্রান্ত হন।

এভাবে পানিশূন্যতা, চলাফেরায় বাধা, কাজে মনোযোগ কমে যাওয়া ও স্থায়ী অস্বস্তি- অনেক নারীর জন্য প্রতিদিনের বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর টয়লেটের অভাব পরিণত হয়েছে নীরব, কাঠামোগত এক অন্তরায়ে।

রাজধানীর বাণিজ্যিক এলাকাগুলোর চিত্রও একই। টিকাটুলীর ক্যাপিটাল সুপার মার্কেটে ক্রেতাদের বেশিরভাগই নারী। সেখানে পুরুষদের জন্য টয়লেট আছে দুটি, আছে নামাজের জায়গা ও অজুখানা। কিন্তু নেই নারীদের টয়লেট। ফলে সেখানকার উদ্যোক্তা নারীদের জরুরি প্রয়োজনে ছুটতে হয় পাশের হাসপাতালে।

৩৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ী বিউটি বলেন, ‘আমাদের ক্রেতাও বেশিরভাগই নারী। তারপরও কেউ আমাদের জন্য টয়লেট বানানোর কথা ভাবেনি। বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর আমি আর পানি খাই না। গলা শুকিয়ে যায়, ঠোঁট ফেটে যায়, রক্তচাপ ওঠানামা করে। তাছাড়া আমাদের আর কি উপায় আছে?’

আইইডিসিআরের উপদেষ্টা জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ মুশতাক হোসেন টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘টয়লেটে যেতে না পারা শুধু অস্বস্তিকর নয়—ঝুঁকিপূর্ণও। দীর্ঘক্ষণ প্রস্রাব চেপে রাখলে ইউটিআইয়ের ঝুঁকি বাড়ে, যা কিডনি পর্যন্ত ছড়িয়ে গুরুতর জটিলতা তৈরি করতে পারে। কর্মস্থল বা বাইরে এই ঝুঁকি আরও বাড়ে, ফলে মনোযোগ ও উৎপাদনশীলতায় প্রভাব পড়ে।’

তিনি বলেন, ‘ক্রমাগত এমন মানসিক চাপে পড়ে নারীরা টয়লেটে যাওয়া কমাতে পানি কম পান করেন। এতে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতার শিকার হন তারা।’ এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব আরও বিস্তৃত। তাতে প্রভাবিত হয় শিক্ষা, কাজ, চলাফেরা সবই।

সবশেষে যে সত্যটি স্পষ্ট তা হলো, বাংলাদেশের আদালত, বাজার, টার্মিনাল, বিদ্যালয় ও কর্মস্থলজুড়ে নারীদের জন্য নিরাপদ, আলাদা, পরিচ্ছন্ন ও রক্ষণাবেক্ষণযোগ্য টয়লেট জরুরি প্রয়োজন। শৌচাগারের মতো একটি মৌলিক প্রয়োজন পূরণের অভাব শুধু নারীদের জীবন অস্বস্তির মুখে ফেলে না বরং অদৃশ্যভাবে ক্ষয় করে তাদের স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও মর্যাদার অধিকার।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad