জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান চলাকালে নারায়ণগঞ্জে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন গুলিতে নিহত রাসেল রানার বাবা পিন্টু রহমান।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ তার জবানবন্দি নেয়। জবানবন্দিতে পিন্টু রহমান জানান, তিনি নওগাঁয় বসবাস করেন। রাসেল রানা নারায়ণগঞ্জে তার ফুফাতো ভাই বুলবুলের ইব্রাহিম কারখানায় কাজ করতেন। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বিকাল ৪টার দিকে রাসেল তাকে ফোন করে আন্দোলনে যাওয়ার কথা জানান এবং দোয়া চান।
পিন্টুর ভাষ্য অনুযায়ী, সেদিন সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে রাসেলের এক বন্ধুর ফোন থেকে তার কাছে কল আসে। তাকে জানানো হয়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে গিয়ে রাসেল গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং গুলি তার বুকে লেগেছে। তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়। তখন নওগাঁয় কারফিউ চলছিল বলে তিনি ঢাকায় আসতে পারেননি। পরে তার ফুফাতো ভাই বুলবুল ও চাচাতো ভাই রফিকুলকে ঢাকা মেডিকেলে পাঠান।
পিন্টু রহমান বলেন, ‘২২ জুলাই সকালে বুলবুল আমাকে ফোন করে জানান, রাসেল ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে মারা গেছে। পরে বুলবুল অ্যাম্বুলেন্সে করে রাসেলের লাশ নওগাঁয় নিয়ে যান। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে রাসেলকে দাফন করা হয়।’
ছেলের মৃত্যুর পর বিভিন্ন পত্রিকা, ফেসবুক ও ইউটিউবের খবর ও ভিডিও থেকে তিনি জানতে পারেন, ১৯ জুলাই সন্ধ্যা ৬টার দিকে নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া এলাকায় আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি চালানোর ঘটনা ঘটেছিল।
জবানবন্দিতে তিনি অভিযোগ করেন, সাবেক এমপি শামীম ওসমান, তার ছেলে অয়ন ওসমান, আজমেরী ওসমান, টিটু, ভিকি, সাংবাদিক রাজু, রিয়াদ, ডিস বাবুসহ নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অস্ত্র নিয়ে চাষাঢ়া এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি চালাতে চালাতে নারায়ণগঞ্জের বিবি রোড ও নয়ামাটির দিকে যায়। তার দাবি, ওই ঘটনায় অনেকে ভিডিও ধারণ করেন এবং প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান তার ছেলে রাসেল আসামিদের গুলিতে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হয়েছেন। জবানবন্দির শেষে পিন্টু রহমান তার ছেলের মৃত্যুর জন্য তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট দায়ী ব্যক্তিদের বিচার চান।
মামলার অভিযোগ
শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে গত ১৩ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। মামলার সব আসামিই পলাতক। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান দমনে শামীম ওসমান অস্ত্র হাতে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন এবং ছাত্র-জনতাকে হত্যার পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। প্রসিকিউশনের দাবি, তিনি নিজেও অস্ত্র হাতে গুলি চালিয়েছেন।
মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে। প্রসিকিউশনের দাবি, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের অনুমতি নিয়ে শামীম ওসমান তার সশস্ত্র বাহিনী হিসেবে মামলার অন্য ১১ আসামিকে সঙ্গে নিয়ে নারায়ণগঞ্জে হত্যাকাণ্ড চালান। মামলায় শামীম ওসমানের পাশাপাশি তার ছেলে অয়ন ওসমান, ভাতিজা আজমেরী ওসমান এবং আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের আসামি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ১৯ ও ২১ জুলাই এবং ৫ আগস্ট নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, চাষাঢ়া ও সাইনবোর্ড এলাকায় মোট ১০ জনকে হত্যার অভিযোগে মানবতাবিরোধী অপরাধের তিনটি অভিযোগ আনা হয়েছে।


