ব্যাটারিচালিত রিকশার প্রতিদিনের আয়ের কারণে এই ব্যবসায় জড়াচ্ছেন অন্য পেশার মানুষরাও। বৃহত্তর উত্তরা অটোরিকশা মালিক ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন, প্রায় অর্ধেক অটোরিকশার মালিক পেশাদার রিকশাচালক ও গ্যারাজ ব্যবসায়ী।
বাকি অর্ধেকের মালিক হিসেবে সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক ও পুলিশ সদস্যরাও আছেন। আছেন অনেক ধনাঢ্যরাও। কোনো ধরনের অনুমোদন প্রয়োজন না থাকায় এবং দৈনিক নগদ টাকা পাওয়ায় মানুষের মধ্যে এই ব্যবসার আগ্রহ তৈরি করেছে।
মালিক ঐক্য পরিষদের সভাপতি আবু বকর টাইমস অব বাংলাদেশকে জানিয়েছেন, উত্তরার মাইলস্টোন কলেজের এক শিক্ষিকারও রিকশা এবং গ্যারেজ আছে। পাকুরিয়ায় বাস-ট্রাক ও বাড়ির মালিক এবং মাসিক আয় ৩০-৩৫ লাখ টাকা এমন ব্যক্তির শতাধিক রিকশা-গ্যারেজ আছে। ওই এলাকায় পুলিশেরও একটি গ্যারেজ রয়েছে। আবার গাজীপুরের বাসিন্দা এক পাইকারী মুরগী ব্যবসায়ীরও ঢাকায় কয়েক শ অটোরিকশা আছে।
সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক কামাল হোসেন লাল চাঁন বলেন, ‘দৈনিক নগদ টাকা পাওয়ার আশায় এ ব্যবসায় মানুষ ঝুঁকছে। পুলিশ আগে মালিকদের সঙ্গে মিটিং করলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখন কোনো মিটিংও হয় না।’
মালিক সমিতির তথ্য বলছে, মান্ডা বাঘপাড়া দরবার গলিতে এক পুলিশ কনস্টেবল আব্দুর রহিমের গ্যারেজে ৬৫টি, কনস্টেবল মানিকের গ্যারেজে ৪৩টি, সাব-ইন্সপেক্টর গোলাম মোস্তফার গ্যারেজে ৫০টি, সিআইডিতে কর্মরত সাব-ইন্সপেক্টর শাহীনের গ্যারেজে ২৬টি রিকশা আছে।
তুরাগের ভাবনারটেকে কনস্টেবল রনির গারেজে আছে ১৮টি রিকশা। ঢাকার দক্ষিণখানে ফায়েদাবাদে সার্জেন্ট বাসেদের গ্যারেজে আছে ৩৮টি রিকশা। মোহাম্মদপুর, মিরপুর, হাজারীবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় পুলিশ সদস্যদের মালিকানার অটোরিকশা বিভিন্ন গ্যারেজে রাখা ও চার্জ দেয়া হয়। মূলত প্রতিটি গ্যারেজই চার্জিং পয়েন্ট।
তবে উল্লেখিতরা তাদের রিকশা বা গ্যারেজে মালিকানার কথা অস্বীকার করে বলেছেন, এসব তাদের আত্মীয় স্বজনদের।
নয়াটোলার গ্যারেজ মালিক মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ডিএমপিতে একাধিক সভায় অটোরিকশার মালিকানা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। পুলিশ মালিক সমিতিকে রিকশা মালিকদের বিস্তারিত বিবরণসহ তালিকা করতে বলেছে। তবে কেউ এই তালিকা তৈরি করেনি।’
দেশে ৫০ লাখ থেকে ৮০ লাখ ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা রয়েছে বলে ধারণা করা হয়। নিষিদ্ধ থাকলেও সেগুলো মহানগরের প্রধান সড়ক, এমনকি জাতীয় মহাসড়কেও যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে। ফলে প্রায়ই প্রাণঘাতি দুর্ঘটনা ঘটছে।
রিকশামালিকেরা পুলিশের সঙ্গে একাধিক সভায় রাস্তায় যাতে নতুন করে রিকশা নামতে না পারে সেজন্য লিখিত প্রস্তাব দিলেও কার্যকর হয়নি। এসব সভায় অটোরিকশার মালিকানায় গাড়ি, বাড়ির মালিক, পুলিশসহ সব শ্রেণি পেশার মানুষ সম্পৃক্ত আলোচনা হলে এর তালিকা করার সিদ্ধান্ত হয়। তবে তা কার্যকর হয়নি।
ঢাকার রাস্তায় প্রায় ১৫ লাখ অটোরিকশা চলাচল করে বলে ধারণা করা হয়। প্রতিদিন প্রায় ৩০০টি নতুন করে সড়কে নামছে।
ঢাকার পাশে সাভার পৌর এলাকার গেন্ডা মহল্লার বিথী মটরস, ঢাকার হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীর চর, মিরপুর, উত্তরার বাউনিয়া, রানাভোলাসহ কয়েকটি স্থানে রিকশাগুলো বানানো হয়। সেখানকার কর্মীরা জানান, একটি রিকশা তৈরি করতে এক লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা প্রয়োজন হয়। তৈরি রিকশা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নেওয়া হয়।
সারা দেশে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে উদ্বেগ-অস্বস্তি আছে। আবার এই ধরনের রিকশাগুলো মানুষের চলাচলের অন্যতম মাধ্যমও হয়ে উঠেছে। বিপুল পরিমাণ সংখ্যা ও কোটি কোটি উপকারভোগীর কারণে সেগুলো নিয়ে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়াও কঠিন হয়ে উঠেছে। এ কারণে পুলিশকে সঙ্গে নিয়ে একটি নীতিমালা করার চেষ্টা হচ্ছে।
ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) আনিছুর রহমান টাইমসকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার জন্য একটি নীতিমালা তৈরির কাজ করছে। ১৫ দিনের মধ্যে এর কাজ শেষ হবে।’
তিনি জানান, এর মালিকানায় বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকলেও নীতিমালায় তা নির্ধারণ করা থাকবে। কারা রিকশার মালিক হতে পারবেন, একজনের কতটি থাকতে পারবে, চলার পথ কী হবে, নিবন্ধন-অনুমোদন, কর সব উল্লেখ থাকবে নীতিমালায়।
অটোরিকশাচালকদের অদক্ষতা ও ট্রাফিক আইন না জানা ও না মানার বিষয়ে জমনে চরম বিরক্তি রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য মতে, অনুমোদিত অটোরিকশা চার্জিং কেন্দ্রের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। তবে শুধু ঢাকাতে ৪৮ হাজার ১৩৬টিরও বেশি অননুমোদিত চার্জিং পয়েন্টের তথ্য রয়েছে গোয়েন্দাদের কাছে।
ডিএমপির সাবেক কমিশনার মো. সরওয়ার অতীতে ট্রাফিক বিভাগেরও দায়িত্বে ছিলেন। তিনি বলেছেন, অটোরিকশা মালিকদের সঙ্গে একাধিক সভা হলেও তা ফলোআপ ও সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন হয়নি।
কার আয় কত
মোহাম্মদপুরের নবীনগর, ঢাকা উদ্যান, নবোদয় হাউজিং, তুরাগ হাউজিং, শনির ধীড়সহ কয়েকটি এলাকায় অটোরিকশার গ্যারেজ ও চার্জিং পয়েন্টে আছে। এই এলাকার প্রায় শতাধিক গ্যারেজে কয়েক হাজার রিকশা রয়েছে।
নবীনগর ৪ নম্বর রোডের চার্জিং পয়েন্টের মালিক নূর মোহাম্মদ রিয়াদ বলেন, প্রতি রিকশা চার্জের জন্য ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। নতুন রিকশার জমা প্রতিদিন ৫০০ ও পুরোনো হলে জমা ৪০০ টাকা।
উত্তরার গ্যারেজ মালিক কামাল হোসেন লাল চাঁন বলেছেন, নতুন রিকশার ৪৫০ ও পুরানোতে দৈনিক জমা ৪০০ টাকা। এর মধ্যে চার্জ খরচ ১২০ টাকা অন্তর্ভুক্ত। নষ্ট হলে সারানোর খরচ মালিকের।
সাভারের গ্যারেজ মালিক খাইরুল ও কালাম বলেন, ভাড়া দিলেও মালিকের ঝুঁকি থাকে। অনেক সময় রিকশা চুরি হয়ে যায়। পরে দালাল ধরে টাকা দিয়ে সেটি উদ্ধার করতে হয়। পুলিশ ধরে ডাম্পিং করলে মালিকের ঝক্কি পোহাতে হয়।
মগবাজার, মিরপুর, মোহাম্মদপুর, হাজারীবাগ, কামরাঙ্গীর চর এলাকার একাধিক রিকশাচালদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মালিকের জমা খরচ দিয়েও তাদের দৈনিক ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। অনেকদিন আয় বাড়ে। বিভিন্ন দিবস ও উৎসবের সময় এবং বৃষ্টি হলেও আয় বাড়ে। তবে, যানজটের কারণে ট্রিপ কমে যাচ্ছে বলে আক্ষেপ করেছেন নয়াটোলার রিকশাচালক গফুর মিয়া।


