বৈষম্য রুখতে উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিতের তাগিদ

বৈষম্য রুখতে উন্নয়নের অধিকার নিশ্চিতের তাগিদ
Advertisement
Advertisement

১৯৮৬ সালে গৃহীত ‘উন্নয়নের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণা’র ৪০ বছর পূর্তি পালন এবং বিশ্বজুড়ে সমতা প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করতে ২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে বিশ্বনেতারা একত্রিত হচ্ছেন।

জাতিসংঘের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিগত চার দশকের অগ্রগতি পর্যালোচনার পাশাপাশি এই শীর্ষ সম্মেলন থেকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার জোর তাগিদ দেওয়া হবে। মূলত দারিদ্র্য কমানো, নতুন সুযোগ তৈরি করা এবং যে বৈষম্যগুলোর কারণে কোটি কোটি মানুষ অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, তা দূর করাই এর মূল লক্ষ্য।

ধনী ও শান্তিপূর্ণ দেশের শিশুদের সঙ্গে দারিদ্র্য, যুদ্ধ, জলবায়ু সংকট কিংবা দুর্নীতিতে জর্জরিত দেশের শিশুদের জীবনের যে আকাশ-পাতাল তফাত—তাকে স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে মনে করে জাতিসংঘ।

কোনো শিশুই তার জন্মস্থান পছন্দ করে নিতে পারে না। অথচ দেখা যায়, উন্নত দেশে জন্মানো শিশুটি দারিদ্র্যপীড়িত দেশের শিশুর চেয়ে গড়ে কয়েক দশক বেশি বাঁচছে, অনেক বেশি আয় করছে এবং সমাজে মতামত প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে।

১৯৮৬ সাল থেকেই উন্নয়নের অধিকারকে সবার জন্য অবিচ্ছেদ্য মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আসছে জাতিসংঘ। বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে এর মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) সহায়তায় তৈরি ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট ২০২৬’ থেকে জানা যায়, বিশ্বের মোট সম্পদের মাত্র ২ শতাংশ রয়েছে সবচেয়ে দরিদ্র অর্ধেক জনগোষ্ঠীর হাতে। অন্যদিকে, বিশ্বের সবচেয়ে ধনী শূন্য দশমিক শূন্য শূন্য এক মানুষ মাত্র ৫৬ হাজার কোটিপতির কাছে দরিদ্র মানুষের মোট সম্পদের চেয়েও তিন গুণ বেশি সম্পদ জমা হয়ে আছে।

আরও পড়ুন

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক সংস্থা (ওএইচসিএইচআর) বলছে, বিভিন্ন দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের এই দিন দিন বাড়তে থাকা বৈষম্য রুখে দেওয়ার জন্যই ‘উন্নয়নের অধিকার’ ধারণার জন্ম।

১৯৮৬ সালে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মেনে নেওয়া এই প্রস্তাবটি আইনিভাবে বাধ্যতামূলক না হলেও, এটি প্রতিটি মানুষ ও জাতির জন্য উন্নয়নে অংশ নেওয়া, অবদান রাখা এবং এর সুফল ভোগ করার অধিকার নিশ্চিত করে। একইসঙ্গে নিজ নিজ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের পূর্ণ অধিকার মেনে নেয়।

জাতিসংঘ জানায়, উন্নয়নের অধিকার মানে কোনো দয়া-দাক্ষিণ্য বা দান-খয়রাত নয়, বরং মানুষকে স্বাবলম্বী ও ক্ষমতাবান করে তোলা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে গত ৮০ বছরে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুষম বণ্টন না হওয়ার কারণেই আজ দারিদ্র্য, সামাজিক অশান্তি, গণ-অভিবাসন এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা হারিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা তৈরি হয়েছে। পুরো বিষয়টি মূলত পাঁচটি মূল নীতির ওপর দাঁড়িয়ে আছে: মানুষকে কেন্দ্রে রেখে উন্নয়ন, সবার সক্রিয় অংশগ্রহণ, সমতা, বৈষম্য না করা এবং নিজের ভাগ্য নিজে নির্ধারণের অধিকার।

এই নীতিগুলোর সঠিক ব্যবহারের ফলে বাস্তবেও বেশ কিছু ভালো ফল পাওয়া গেছে। যেমন: মরক্কোয় নারীদের কারিগরি প্রশিক্ষণ, কলম্বিয়ার শান্তি চুক্তিতে আদিবাসীদের অংশগ্রহণ এবং আফগানিস্তান, ভারত ও ফিলিস্তিনের বিভিন্ন এলাকায় ন্যায্যভাবে সম্পদ ভাগাভাগির ব্যবস্থা।

তবে বিভিন্ন দেশের নানা বাধ্যবাধকতা নিয়ে মতবিরোধ, দুর্বল আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাবে এর অগ্রগতি থমকে আছে।

করোনা মহামারীর সময় এই কাঠামোগত দুর্বলতা খুব করুণভাবে ফুটে উঠেছিল। টিকার অসম বণ্টন এবং ২০২১ সালের মধ্যে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দেওয়া লক্ষ্য পূরণ করতে না পারায় ৬ লাখেরও বেশি মানুষ মারা যান, যা সহজেই ঠেকানো যেত। জাতিসংঘের এক কর্মকর্তা এই ঘটনাকে ‘অত্যন্ত মর্মান্তিক ও চরম অনৈতিক’ বলে আখ্যা দেন।

জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধবিগ্রহ কিংবা অভিবাসন সংকটের মতো একের পর এক বৈশ্বিক সমস্যা এখন দারিদ্র্য ও বৈষম্যকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। এই অবস্থায় জাতিসংঘ মনে করে, পরিস্থিতি ইতিবাচক দিকে ঘোরাতে একটি ন্যায্য উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জরুরি।

Follow TIMES on Google News

Get trusted updates and editor-picked stories in your feed.

Follow
সম্পর্কিত খবর
Ad