বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংক্রান্ত গবেষণার জন্য আলাদা ইনস্টিটিউশন তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস।
বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথিভবন যমুনায় জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা ২০২৬-২০৫০ সংক্রান্ত সভায় তিনি এ নির্দেশ দেন বলে জানিয়েছে সংবাদ সংস্থা বাসস।
প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের আলাদা ইনস্টিটিউট হতে হবে। এটা মন্ত্রণালয়ের অধীনে হলে চলবে না। এটি একটি আলাদা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হবে যা পৃথিবীতে এ সম্পর্কিত যত সংস্থা আছে সবগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখবে এবং পলিসি তৈরিতে সরকারকে সাহায্য করবে।’
‘অতীতে যা হয়েছে সবই খাপছাড়া। তাই একদম শুরু থেকে চিন্তা করতে হবে। একরকমভাবে হয়ে আসছে সেজন্য সেই পথেই যেতে হবে এমন কোনো কথা নেই। অনেক কিছু ভুল লোকেশনে, ভুল স্ট্রাকচারে হয়েছে। এমনটা যেন আর না ঘটতে পারে। একটা কাঠামো, নিয়মের মধ্যে যেন থাকে সেটা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। সেজন্য গবেষণাকেন্দ্র জরুরি,’ যোগ করেন তিনি।
মুহাম্মদ ইউনূস এই খাতকে বাংলাদেশের প্রাণ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, এই খাত সবল হলে অর্থনীতি দাঁড়াবে। দেশের প্রতিটি মানুষের জীবনকে এটি প্রভাবিত করে। তাই এর জন্য বিকল্প উৎস নিয়েও গবেষণা করতে হবে।’
বুধবারের ওই সভায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাত মহাপরিকল্পনা ২০২৬-২০৫০ উপস্থাপন করে বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়।
প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে সেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, অর্থ উপদেষ্টাসালেহউদ্দিন আহমেদ, বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশির উদ্দিন, শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।
সভায় উপস্থাপিত মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হলো দেশীয় সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহার, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত দায়বদ্ধতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সকল মানুষের জন্য নির্ভরযোগ্য, সাশ্রয়ী ও টেকসই প্রাথমিক জ্বালানি ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করা।
এতে আগের তিনটি মহাপরিকল্পনার পলিসি গ্যাপ চিহ্নিত করে তা সংক্ষেপে পর্যালোচনা করা হয় এবং নতুন তিন ধাপে তা বাস্তবায়নের বিষয়ে আলোচনা হয়।
এর মধ্যে ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের প্রথম ধাপে ফার্স্ট ট্র্যাক প্রায়োরিটি প্রজেক্টস পরিকল্পনায় অফশোর অনুসন্ধান রাউন্ড, গ্যাস উৎপাদন বৃদ্ধি, এলএনজি সরবরাহ, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ, রিফাইনারি সক্ষমতা সম্প্রসারণ, কৌশলগত জ্বালানি মজুদ সক্ষমতা সম্প্রসারণের মতো কাজ বাস্তবায়নের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে।
পরবর্তীতে ২০৩০ থেকে ২০৪০ সাল অবধি দ্বিতীয় ধাপ ও ২০৪০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে তৃতীয় ধাপে বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে।
দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত প্রকল্পগুলোয় অফশোর গ্যাস উন্নয়ন, বৃহৎ পরিসরে রিফাইনিং ও পেট্রোকেমিক্যাল শিল্প সম্প্রসারণ, হাইড্রোজেন ও অ্যামোনিয়া অবকাঠামো উন্নয়ন, ভূ-তাপীয় (জিওথার্মাল) শক্তি উন্নয়ন এবং জোয়ার-ভাটা ও সমুদ্র তরঙ্গভিত্তিক শক্তি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়েও সভায় আলোচনা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় জানায়, এই মহাপরিকল্পনায় জ্বালানি খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি সত্ত্বেও কীভাবে দক্ষতা বৃদ্ধি ও পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত করে জলবায়ু প্রভাব কমানো সম্ভব এবং একইসঙ্গে উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুযোগও সৃষ্টি করা যায় তা তুলে ধরা হয়েছে।
বিদ্যুৎ চাহিদা ২০৫০ সালের মধ্যে ১৭ গিগাওয়াট থেকে বেড়ে ৫৯ গিগাওয়াটে পৌঁছাবে, যা পরিবেশগত ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় মোট নিঃসরণ বাড়বে, তবে পরিচ্ছন্ন ও অধিক দক্ষ প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনে নিঃসরণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাবে।
২০৫০ সালের মধ্যে জলবায়ু সংক্রান্ত উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে বার্ষিক ৬৪ দশমিক পাঁচ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড এবং মোট এক হাজার ৬০০ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই অক্সাইড নিঃসরণ হ্রাস সম্ভব হবে।
মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে কিছু সংস্কার বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি আইন বাতিল করা হয়েছে, মার্চেন্ট পাওয়ার পলিসি, রিনিউবেল এনার্জি পলিসি, রুফটপ সোলার প্রোগ্রাম এবং নেট মিটারিং গাইডলাইন নেওয়া হয়েছে।
সভায় বিদ্যুৎ উৎপাদন, ট্রান্সমিশন, সরবরাহ, পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক সাস্টেইনবিলিটি এবং প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার বিষয়ে কিছু সুপারিশ উপস্থাপন করা হয়। ২০৫০ সালের মধ্যে প্রাইমারি এনার্জি সেক্টরকে আরও নিরাপদ, দক্ষ, কম আমদানিনির্ভর ও আর্থিকভাবে টেকসই করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৫০ সাল মেয়াদে জ্বালানি খাতে ৭০ থেকে ৮৫ বিলিয়ন ডলার এবং বিদ্যুৎ খাতে ১০৭ দশমিক ২৫ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে।


