পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক তিনটি পৃথক জাতীয় কমিটি গঠনের প্রতিবাদ জানিয়েছে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলন’। একই সঙ্গে এসব কমিটি বাতিলসহ ৮ দফা দাবি উত্থাপন করা হয়েছে।
সোমবার বিকালে রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘরের সামনে অনুষ্ঠিত এক নাগরিক সমাবেশে এসব দাবি ও প্রতিবাদ জানানো হয়।
পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনের যুগ্ম সমন্বয়কারী ও মানবাধিকার কর্মী জাকির হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সমাবেশে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, এএলআরডির নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, গণফোরাম সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুল রশীদ ফিরোজ, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স এবং লেখক ও গবেষক ঈশিতা দস্তিদারের মতো বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত ছিলেন।
সমাবেশে বিভিন্ন সামাজিক ও জাতীয় পর্যায়ের ছাত্র-যুব সংগঠনের নেতৃবৃন্দ পার্বত্য চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবিতে সংহতি প্রকাশ করেন।
সভাপতির বক্তব্যে জাকির হোসেন বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ‘এই চুক্তি আমাদের সঙ্গে হয়নি, অন্য দল বা ব্যক্তির সঙ্গে হয়েছিল’—এমন মন্তব্য করা রাজনৈতিক অপরিপক্কতার পরিচয়। কারণ, কোনো সরকারপ্রধান চুক্তিতে স্বাক্ষর করলে তা রাষ্ট্রের চুক্তি হিসেবেই গণ্য হয়।
রাষ্ট্রীয় বা আন্তর্জাতিক চুক্তি সরকার পরিবর্তনের অজুহাতে অস্বীকার করা অযৌক্তিক উল্লেখ করে তিনি এসডিজি’র উদাহরণ দেন এবং বলেন, চুক্তি পর্যালোচনা করে তা শক্তিশালী করা সম্ভব, তবে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়া রাজনৈতিক আন্তরিকতাহীনতারই প্রকাশ।
বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, ১৯৯৭ সালের এই চুক্তিটি কোনো একক রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে হয়েছিল। সরকার যদি মনে করে এই চুক্তিতে কোনো সমস্যা রয়েছে, তবে স্পষ্ট বক্তব্য দেওয়ার পাশাপাশি তা পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা করে দ্রুত বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়া উচিত। তিনি পাহাড়ের সর্বস্তরের জাতিগোষ্ঠীর স্বীকৃতি নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান।
বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধান পাহাড়ে পাহাড়ি প্রতিনিধিকে মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার পর বাদ দেওয়া এবং নতুন একাধিক কমিটি গঠনের সমালোচনা করেন।
পাহাড়ি জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক কৌশলের শিকার না বানিয়ে এবং মৌলিক শর্তসমূহ এড়িয়ে না গিয়ে মূল সমস্যা সমাধানের দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে তাদেরকে ‘আদিবাসী’ বা সম-অধিকারপ্রাপ্ত নাগরিক হিসেবে গণ্য করার ওপর জোর দেন।
এএলআরডি-র নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা উল্লেখ করেন, খালেদা জিয়ার আমলেও পাহাড়ি প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর মওদুদ আহমেদ পর্যালোচনা করে জানান যে চুক্তিতে রাষ্ট্রবিরোধী কিছু নেই। ফলে তৎকালীন বিএনপি সরকারও চুক্তিটি বাতিল করেনি, যা এটি যে রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর নয় তার প্রমাণ দেয়।
সাংবাদিক আবু সাঈদ খান বলেন, পার্বত্য অঞ্চলের প্রধান সমস্যাটি আমাদের রাজনীতি ও প্রশাসনিক কাঠামোর মনস্তত্ত্বে নিহিত। পার্বত্য অঞ্চলকে নাকি ‘অনেক কিছু দিয়ে ফেলা হয়েছে’—আমলা বা রাজনীতিবিদদের এই ভুল ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।
তিনি বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থানীয় সরকারকে দেওয়া ক্ষমতা লন্ডনের কাউন্টিগুলোর চেয়ে বেশি নয়। পরিশেষে তিনি বাঙালি, চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, সাঁওতাল ও গারোসহ সকল জাতিসত্তাকে এক সূত্রে গাঁথার পাশাপাশি সকল জনগোষ্ঠীর প্রতি ইতিবাচক মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন আনার আহ্বান জানান।
সমাবেশ থেকে পাহাড়ের স্থায়ী শান্তির লক্ষ্যে ৮ দফা দাবি জানানো হয়, যার মধ্যে উল্লিখিত সাংঘর্ষিক কমিটিগুলো বাতিল, চুক্তি বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ কমিটি গঠন, অ-পাহাড়ী প্রতিমন্ত্রীকে প্রত্যাহার করে উপদেষ্টা পরিষদ পুনর্গঠন, সময়সূচিভিত্তিক পরিকল্পনা ও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন কার্যকর করা এবং সরকারের উদ্যোগে বহুপক্ষীয় সংলাপ শুরু করার বিষয়সমূহ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।


