২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও র্যাবের সদস্যরা গুলি চালায় বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দি দিয়েছেন মো. নবী হোসেন সজিব। তার দাবি, ওই গুলিতে তিনি নিজে আহত হন এবং আরও দুজন নিহত হন। নিহতদের একজনের পেটে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায় এবং অপরজনের তলপেটে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মঙ্গলবার জবানবন্দি দিতে গিয়ে এমন বর্ণনা দিয়েছেন প্রসিকিউশনের সাক্ষী মো. নবী হোসেন সজিব।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ জবানবন্দি গ্রহণ করে। মামলাটিতে রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় ২৩ জন আন্দোলনকারী নিহত হওয়ার ঘটনায় আসামিদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে।
২২ বছর বয়সী সজিবের গ্রামের বাড়ি চাঁদপুরের শাহরাস্তি এলাকায়। বর্তমানে তিনি বাড্ডার মেরুল এলাকায় থাকেন এবং পেশায় গ্রিল মিস্ত্রি। ছাত্রদের ওপর নির্যাতনের প্রতিবাদে তিনি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন বলে জবানবন্দিতে জানান। জুলাই যোদ্ধাদের নিয়ে সরকারের প্রকাশিত গেজেটে ‘সি’ ক্যাটাগরিতে তার নাম রয়েছে।
১৮ থেকে ২০ জুলাইয়ের বিবরণ
সজিব জানান, ১৮, ১৯ ও ২০ জুলাই তিনি মেরুল বাড্ডার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে অংশ নেন। ১৮ জুলাই আন্দোলনের সময় পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও হেলমেট বাহিনী রাস্তা অবরোধ করায় তিনি বাসায় ফিরে যান।
পরদিন শুক্রবার জুমার নামাজের পর তিনি আবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে যান। তার জবানবন্দি অনুযায়ী, সেখানে পুলিশ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের লোকজন কোনো সতর্কতা ছাড়াই গুলি চালাতে শুরু করে। ওই গুলিতে উত্তর বাড্ডা, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে এবং মধ্য বাড্ডা ইউটার্নের সামনে একজন করে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন বলে তিনি দাবি করেন।
অনেকে আহত হওয়ার পর তিনি অন্য আন্দোলনকারীদের সঙ্গে মিলে আহতদের কাউকে রিকশায়, কাউকে ভ্যানে তুলে হাসপাতালে পাঠান বলে জানান। রাস্তায় রক্ত দেখে তার বমি আসে এবং পরে তিনি বাসায় ফিরে যান।
২০ জুলাই তিনি আবার ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আন্দোলনে যোগ দেন। সেদিন তারা রামপুরার দিকে অগ্রসর হলে টিভি সেন্টারের সামনে মেইন রোড থেকে তাদের লক্ষ্য করে গুলি করা হয় বলে সজিব জানান। তার দাবি, ওই ঘটনায় দুজন নিহত এবং অনেকে আহত হন। আহতদের আন্দোলনকারীদের সহায়তায় রিকশা ও ভ্যানে করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
৫ আগস্ট গুলিতে আহত
সজিবের জবানবন্দি অনুযায়ী, ৫ আগস্ট তিনি মেরুল বাড্ডার ১৫ নম্বর রোডে আন্দোলনে যোগ দেন। তার বাসা ওই সড়কে। দুপুরে বাসায় খাবার খেয়ে আনুমানিক আড়াইটার দিকে তিনি আবার আন্দোলনস্থলে ফিরে আসেন।
তার ভাষ্য, সেখানে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হওয়ার পর আন্দোলনকারীরা মেইন রোডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পুলিশ মেইন রোড ঘিরে রেখেছিল। এরপরও তারা মেইন রোডে গেলে আন্দোলনকারীদের ওপর পুলিশ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও র্যাবের সদস্যরা গুলি চালায় বলে সজিব অভিযোগ করেন।
সজিব জানান, ওই গুলিতে তিনি নিজে আহত হন এবং আরও দুজন গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন। তার শরীরে প্রায় ১৫০টি পিলেট রয়েছে। এ সময় ট্রাইব্যুনালে তিনি শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুলির চিহ্ন দেখান।
তিনি বলেন, নিহত দুজনের একজনের পেটে গুলি লেগে পিঠ দিয়ে বের হয়ে যায় এবং অপরজনের তলপেটে গুলি ঢুকে পিঠ দিয়ে বেরিয়ে যায়।
শরীরে এখনো পিলেট
গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সজিব কুর্মিটোলা ও ঢাকা সিএমএইচ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তার দাবি, সিএমএইচে চিকিৎসার সময় শরীর থেকে ২৫টি পিলেট বের করা হয়। চিকিৎসকেরা তাকে জানান, তার পিঠের হাড়ের মধ্যে আরও একটি পিলেট রয়েছে, যা বের করা সম্ভব নয়।
জবানবন্দির শেষ দিকে সজিব ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের সময় হতাহতের জন্য রাশেদ খান মেনন, কামরুল ইসলাম এবং তৎকালীন শেখ হাসিনা সরকারকে দায়ী করেন এবং জড়িতদের বিচার দাবি করেন।
মেনন ও কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে মামলায় এর আগে দেওয়া সাক্ষ্যগুলোতেও রামপুরা-বাড্ডা এলাকায় আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ও হতাহতের বর্ণনা এসেছে। প্রসিকিউশনের অভিযোগ, জুলাই আন্দোলনের সময় কারফিউ জারি ও তা কার্যকরের মাধ্যমে হতাহতের ঘটনায় আসামিদের ভূমিকা ছিল।


