কক্সবাজারের চকরিয়ায় বন্যার পানি থেকে বাঁচতে নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময় নৌকা উল্টে দুই বোনের মৃত্যু হয়েছে।
শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে উপজেলার রসুলাবাদ এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে।
নিহত হাসনাতুল জন্নাত ঝর্ণা (১৩) ও শাওরিন মনি (৭) ওই এলাকার আবদুল মালেকের মেয়ে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, টানা ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে আবদুল মালেকের বাড়ির চারপাশ তলিয়ে যায়। পানি বাড়ায় স্ত্রী ও তিন মেয়েকে নিয়ে ডিঙি নৌকায় নিরাপদ আশ্রয়ে রওনা হন তিনি। পথে ঝড়ো বাতাসে নৌকাটি উল্টে যায়।
নৌকাডুবির পর মা লাকি আক্তার (৩১) ও আরেক বোন জেরিন মনি (৯) সাতার কেটে তীরে উঠতে পারলেও নিখোঁজ হয় ঝর্ণা ও শাওরিন। চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও চট্টগ্রাম থেকে আসা ডুবুরি দল চার ঘণ্টা উদ্ধার অভিযান চালায়। দুপুর দেড়টার দিকে পানির নিচ থেকে ঝর্ণার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার হওয়া শাওরিন মনিকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
চকরিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের স্টেশন কর্মকর্তা দিদারুল হক বলেন, ‘বন্যার পানিতে নৌকাডুবির ঘটনায় খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযান শুরু করা হয়। ডুবুরি দলের সহায়তায় চার ঘণ্টা পর তাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।’
বরইতলী ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য কাইছার উদ্দিন বলেন, ‘পরিবারটি নিরাপদ জায়গায় যেতে চেয়েছিল। দুর্যোগের মধ্যে এই যাত্রাই তাদের জীবনে সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হয়ে দাঁড়াল।’
পাহাড় ধস ও বন্যায় নিহত ২৪
গত পাঁচ দিনে জেলায় পাহাড় ধস ও বন্যায় দুই বোনসহ ২৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাঁচ দফা পাহাড় ধসে মারা গেছেন ১৫ জন, যাদের অধিকাংশই শিশু। গত বুধবার মাদ্রাসায় পড়ার সময় পাহাড় ধসে ৫ শিশু শিক্ষার্থী মারা যায়।
এ ছাড়া কক্সবাজার শহরে দুজন, চকরিয়ায় তিনজন, পেকুয়ায় একজন, উখিয়ায় একজন, মহেশখালীতে একজন ও কুতুবদিয়ায় একজনের মৃত্যু হয়েছে। বৃহস্পতিবার রাতে চকরিয়ার বরইতলী ইউনিয়নে পাহাড় ধসে দুই শিশু মারা যায়। আহত হয়েছেন ২০ জনের বেশি মানুষ।
বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত, পানিবন্দি ৫ লাখ মানুষ
টানা ছয় দিনের ভারী বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ভাসছে কক্সবাজারের বিস্তীর্ণ এলাকা। চকরিয়া, পেকুয়া ও মাতামুহুরীসহ জেলার ৩৫টি ইউনিয়নের অন্তত শতাধিক গ্রাম এখন পানির নিচে। কোথাও কোথাও ঘরবাড়িতে কোমর সমান পানি। বন্যায় জেলার ৫ লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন।
শুক্রবার সকাল থেকে বৃষ্টি কমলেও নদীগুলোর পানি এখনো বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সড়কগুলো দীর্ঘদিন পানির নিচে থাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। স্থানীয়দের মতে, পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র বোঝা যাবে।
চকরিয়া পৌরসভাসহ বিভিন্ন ওয়ার্ড পানিতে তলিয়ে গেছে। চকরিয়া সরকারি কলেজে হাঁটু পরিমাণ পানি ঢোকায় ক্লাস ও দাপ্তরিক কাজ বন্ধ রয়েছে। পেকুয়া সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এম বাহাদুর শাহ জানান, পেকুয়া পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা কাটাতে খালের আবর্জনা পরিষ্কার করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। খুলে দেওয়া হয়েছে স্লুইস গেট।
বিপদসীমার ওপরে দুই নদী
কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী নুরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্বিতীয় দিনের মতো বিপদসীমার ওপর দিয়ে চলছে। বাঁকখালীর বিপদসীমা ৫ দশমিক த৯ মিটার ও মাতামুহুরীর ৫ দশমিক ৮০ মিটার। জেলার কোথাও বেড়িবাঁধ ভাঙেনি। তবে চকরিয়ার কোনাখালীতে বেড়িবাঁধ উপচে লোকালয়ে পানি ঢুকেছে।
বৃষ্টিপাত ও জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান জানান, শুক্রবার বিকেল ৩টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ৭১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। গত ৫ দিনে জেলায় ৫৪৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগামী ১১ জুলাই পর্যন্ত এই বৃষ্টি বজায় থাকতে পারে।
বর্তমানে কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল আছে। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পরিদর্শন করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে উপজেলা প্রশাসন। বাসিন্দাদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে।’
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমের সঙ্গে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে কন্ট্রোল রুমের ০১৮৭২৬১৫১৩২ নম্বরে যোগাযোগের অনুরোধ জানিয়ে তিনি দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া কেটে না যাওয়া পর্যন্ত সবাইকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দিয়েছেন।


