‘দশে মিলি করি কাজ, হারি জিতি নাহি লাজ’- জীবনে চলার পথে এই প্রবাদবাক্যটি অনেকেই হয়তো শতভাগ কাজে লাগিয়ে সফল হয়েছেন। এমনই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার বাবুপুরের গ্রামবাসী। নিজ উদ্যোগে অর্থ সংগ্রহ করে গ্রামের তরুণদের জন্য খেলার মাঠ বানিয়ে দেবার অনন্য নজির গড়েছেন তারা। যা ইতোমধ্যেই সারা দেশের জন্য একটি রোলমডেল হিসেবে বিবেচিত হয়েছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাবুপুর গ্রামের বাসিন্দারা প্রশংসায় ভাসছেন।
বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নজরে এলে, তিনি তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ পাঠিয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হককে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে দেলদুয়ার উপজেলায় সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে যোগাযোগ করে মাঠের বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী রোববার জাতীয় ক্রীড়া পরিষদে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রতিশ্রুতির ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে তিনি দেলদুয়ারের এই মহতী উদ্যোগের জন্য অচিরেই উদ্যোক্তা ক্যাটাগরিতে তাদেরকে পুরস্কৃত করার ঘোষণা দেন। এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা যুথীসহ বাবুপুর গ্রামের মাঠ তৈরির উদ্যোক্তারা সকলেই উপস্থিত ছিলেন।
গ্রামের ছেলে-মেয়েদের খেলার মাঠে ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে বাবুপুরের বেশ কিছু গ্রামবাসী মিলে খেলার মাঠ তৈরির উদ্যোগ নেন। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মাঠমুখী করতে বাবুপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে মাইকিং করে একটি সভার আয়োজন করা হয়। যেখানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সবাই অংশ নেন।
এ প্রসঙ্গে মাঠ তৈরির অন্যতম উদ্যোক্তা মো. খোরশেদ আলম বলেন, ‘এই গ্রামে বাচ্চাদের খেলার কোনো সুযোগ-সুবিধা ছিলনা। খাস জমিতে ফসল কাটার পর যে ১৫দিন জমিটি খালি থাকত সে সময় সেখানে সবাই খেলাধুলায় মেতে উঠেতো। কিন্তু পরে আবারও সেই একই চিত্র। ফলে ক্রমেই তরুণরা খেলাধুলার সুযোগ না পেয়ে মাদকাসক্তি ও অন্যান্য অসামাজিক কাজে জড়িয়ে পড়ে।’
তিনি বলেন, পরবর্তীতে আমরা অনেকে মিলে সেখান থেকে তরুণদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিই। আয়োজিত সভায় সকলের অংশগ্রহণ তাদের উৎসাহিত করে তোলে। ২০০, ৪০০, ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে একে একে সবাই চাঁদা দিতে থাকলে সব মিলিয়ে ঐ সভায় প্রায় ৮ লাখ টাকা তহবিলে জমা হয়। এভাবে প্রায় দেড় মাসের মধ্যে ৩২ লাখ টাকা সংগৃহীত হয়, যেখানে প্রবাসীসহ আশপাশের গ্রামবাসীও অবদান রেখেছেন।
সেই টাকা দিয়ে ইকবাল হোসেন সুজনের ৫৯ শতাংশ জমি ক্রয় করে মাঠের জন্য জায়গা নেয়া হয়। গত ২৯ অক্টোবর সকলে মিলে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে ও জাতীয় সংগীত বাজিয়ে জমিটিকে স্থায়ীভাবে খেলার মাঠের জন্য নির্ধারণ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জোহরা সুলতানা জুথী জানান, ‘শিশু ও কিশোরদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য স্থায়ী খেলার মাঠের অভাব পূরণের জন্য বাবুপুর গ্রামের সাধারণ জনগণ বাবুপুর মৌজার ১৮১৬ নং দাগের ৫৯ শতাংশ জমি ক্রয়ের জন্য স্থানীয়দের উদ্যোগে ৩২ লাখ ১৬ হাজার টাকা উত্তোলন করে। যদিও খেলার মাঠের জন্য জমি দলিল করে দেওয়া হয়নি। ২৯ অক্টোবর জমিটি খেলার মাঠের জন্য উদ্বোধন করা হয়েছে।’
সরকারের প্রতিটি ইউনিয়নে খেলার মাঠে তৈরির যে উদ্যোগ রয়েছে তারই ধারাবাহিকতায় পূর্ণাঙ্গ খেলার মাঠ তৈরিতে বাবুপুরে ৫৯ শতাংশের সাথে সব মিলিয়ে আরও ১৮০ শতক জায়গা প্রয়োজন।
এ প্রসঙ্গে জোহরা সুলতানা জুথী বলেন, ‘পাকা রাস্তা থেকে জমিটি ২৫০ ফুট পূর্বদিকে অবস্থিত ১৮১৬ নং দাগটি বর্তমানে ফসলি জমি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, যেখানে ধান রয়েছে। এটা তিন ফসলি আবাদি জমি। ১৮১৬ দাগের আশেপাশে কোনো সরকারি খাস জমি নেই। ২৩৯ শতক জমি নিয়ে মাঠ তৈরি করা হলে বাকি ১৮০ শতক জমি অধিগ্রহণ করে খেলার মাঠ বানাতে হবে। এজন্য ১৮০ শতক কান্দা শ্রেণির জমির মূল্য তিনগুণ হিসেবে ৩ কোটি ৪১ লাখ ৩৪ হাজার ৪৮০ টাকা।
এছাড়া ১৩০২ নং দাগের জমিতে একটি বাড়ি রয়েছে। সে হিসেবে অবকাঠামো, গাছপালার মূল্য হিসেবে আরও প্রায় ৬০ লাখ টাকার প্রয়োজন। সব মিলিয়ে ৪ কোটি ৪১ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৮ টাকা প্রয়োজন।
ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী পুরো বিষয়টি জেনে এ ব্যপারে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন। এ ধরনের একটি উদ্যোগের প্রশংসা করে সরকারের পক্ষ থেকে উপজেলার সংশ্লিষ্ট সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অন্যদেরও তা অনুকরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ সম্পর্কে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক বলেন, ‘এভাবেও এগিয়ে আসা যায়, বিষয়টি আমাকে সত্যিই অবাক করেছে। খেলার মাঠের জন্য বাবুপুর গ্রামের মানুষের এমন স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ আমাদের ক্রীড়াঙ্গনে এক ভিন্ন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সরকার ও মন্ত্রণালয় সবসময় এমন ইতিবাচক কাজকে উৎসাহ দিতে চায়। শিশু-কিশোরদের খেলাধুলার সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা যদি এই গ্রামবাসীর পাশে থাকতে পারি, তা হবে বিশেষ কিছু। একইসাথে বাবুপুর গ্রাম পুরো দেশের জন্য একটি রোল মডেল হয়ে থাকবে।’


